মোঃ আব্দুর রব মনসুর, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: কাজিপুর উপজেলার খরস্রোতা যমুনা নদীর বুক চিরে নাটুয়ারপাড়ার ঐতিহ্যবাহী জলরাশি এখন কেবল নদীর কলতান নয়, মুখরিত হয়ে উঠেছে কৃষকের সোনালী ফসলের দ্যুতিতে। অনুকূল আবহাওয়া ও সাশ্রয়ী উৎপাদন খরচে এবার কাজিপুরে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে নদীপারের খেটে খাওয়া মানুষের মুখে ফুটে উঠেছে স্বস্তির ঝিলিক।
যমুনার বক্ষে নৌকা আর নৌকার মিতালীতে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী ভাসমান হাট যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। সড়কপথের ঝামেলা এড়িয়ে নদীপথে সহজ যাতায়াত ও পরিবহন খরচ কম হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা ভিড় করছেন এই হাটে। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পকেটেই লাভের সুবাতাস বইছে।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সার ও কীটনাশক সাশ্রয়ী মূল্যে হাতের নাগালে থাকায় প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ মন ফলন ঘরে তুলে কৃষকেরা এখন দারুণ সময় পার করছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীর ঘাটে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো আর রোদে শুকানোর ধুম পড়েছে।
বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকায়। সোনালী আঁশের এই ন্যায্য দাম পাওয়ায় হাসি ফুটেছে কাজিপুরের চাষিদের মুখে। যমুনার ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাই এখন খুশির জোয়ার বইছে নদীপারের গ্রামীণ অর্থনীতিতে।
মাঠজুড়ে সবুজের ঢেউ পেরিয়ে কৃষকের ঘরে এখন উঠেছে সোনালী আঁশ। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন ও কাঙ্ক্ষিত বাজার মূল্যে চাষিদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে সোনালী স্বপ্ন পূরণের অনাবিল হাসি। রোদে পোড়া, ঘামে ভেজা কৃষকের কষ্টের ফসল এবার যেন সত্যিই সোনা হয়ে ধরা দিয়েছে কাজিপুরের গ্রামীণ জনপদে।
উপজেলার মাথাইল চাপড় গ্রামের পাটচাষি আবুল হোসেন, উদগাড়ীর বকুল এবং পানাগাড়ীর সিদ্দিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান, এবার পাটের ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারে এর দামও চমৎকার। শুধু পাটই নয়, জ্বালানি ও নানা গৃহস্থালি কাজে পাটখড়ির বিপুল চাহিদা থাকায় তা বিক্রি করেই উঠে আসছে পাট চাষের মূল খরচ। ফলে পাটের বাজার মূল্য পুরোটাই কৃষকের ঘরে উদ্বৃত্ত মুনাফা হিসেবে জমা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর কাজিপুর উপজেলায় ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অনুকূল আবহাওয়া আর সঠিক পরিচর্যায় এবার প্রতি হেক্টরে গড়ে আড়াই (২.৫) মেট্রিক টন পাটের উৎপাদন হয়েছে। সেই হিসাবে উপজেলায় মোট পাট উৎপাদিত হয়েছে ১০ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী যার আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬ কোটি ১২ লক্ষ ৫ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে কাজিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো: শরিফুল ইসলাম জানান, সরকারের দূরদর্শী কৃষি ভর্তুকি এবং সময়োপযোগী প্রণোদনা কৃষকদের পাট চাষে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ায় এবার পাটের এই বাম্পার ফলন সম্ভব হয়েছে।
সোনালী আঁশের এই বাম্পার ফলন ও অভাবনীয় বাজার মূল্য কাজিপুরের অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কৃষকদের এই হাসিমুখ ধরে রাখতে আগামীতেও সরকারি এমন পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় চাষিদের।