
দালাল হালাল পার্টি লাইন ও কৌশল :
নড়াইলের পার্টির দালাল-হালাল সম্পর্কিত কর্মকাÐ সম্পর্কে কমরেড অমল সেন ও অন্যদের কাছ থেকে যা জেনেছি ও কমরেড নূর জালালের স্বহস্তে লিখিত ১৮০ পৃষ্ঠার বই থেকে ঘটনাবলি আমার লেখায় উল্লেখ করছি। কমরেড নূর জালালের বড় ভাই নূরুল হুদাকে হত্যার আগে কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সির গ্রাম চাঁনপুরে একজনকে হত্যা করা হয়েছিল। নেমে এসেছিল ঐ গ্রামে সীমাহীন নির্যাতন। যদিও কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সি গ্রেফতার এড়িয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। নূরুল হুদাকে হত্যার পর দূর্গাপুর, ডুমুরতলা, নয়নপুর, বাহিরডাঙ্গা এসব গ্রামেও নেমে এসেছিল সীমাহীন নির্যাতন। কমরেড নূর জালালসহ অনেকেই আত্মগোপনে থাকার কারনে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন। কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সির গ্রামে হত্যাকাÐের পর তার চাচাতো ভাই কমরেড আব্দুল গণি পশ্চিম বাংলায় পালিয়ে যান। অতীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্কিত এক ব্রাহ্মণ মহিলাকে বিয়ে করেন। নিজেও স্বঘোষিত ব্রাহ্মণ হয়ে যান। কমরেড আব্দুল গণি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। শেষ বয়সে নিজের সম্পত্তির অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন। বহু চেষ্টা করে সম্পত্তির অধিকার না পেয়ে পুনরায় ভারতে ফিরে যান।
বড়েন্দারের শ্যামা কামারকে হত্যার প্রচেষ্টা নিলে এবং তাকে আহত করলে তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এগারোখানের হাতিয়াড়া গ্রামের পুলিনকে হত্যার পর ঐ অঞ্চলেও নেমে এসেছিল সীমাহীন নির্যাতন। এই সময়কালে কমরেড রাজেন সিকদারকে শত্রুরা হত্যা করেছিলো। কোথায় কিভাবে হত্যা করেছিলো তা অদ্যাবধি জানা যায়নি। সাম্প্রদায়িক পাকিস্থান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দেশ ত্যাগের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তাতে নড়াইলের পার্টির অনেক নেতা-কর্মীর পরিবারের দেশ ত্যাগের কারনে কোথায় থাকবে, খাবে এর সহজ সমাধান ছিলনা। সেকারণে অনেকেই দেশ ত্যাগ করেন। আবার ঠিক ঐসময়ে দালাল-হালাল লাইন কার্যকরী হওয়ার কারণে যে সীমাহীন নির্যাতন নেমে এসেছিল তার ফলে অনেক নেতাকর্মী দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেদিনকার সেই পরিস্থিতিতে যারা দেশ ত্যাগ করেছিলেন তাদেরকে আমি দোষারোপ করছি না। কমরেড অমল সেন, কমরেড হেমন্ত সরকার তাদেরও থাকা-খাওয়ার জায়গা ছিলনা। কিন্তু তারা দেশ ত্যাগ না করে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন অন্যরাও দেশত্যাগ না করে শত নির্যাতনের মুখেও যদি টিকে থাকতে পারতেন তাহলে হয়তো ভিন্ন ইতিহাস সৃষ্টি হতে পারতো। একদিকে কমরেড অমল সেনকে প্রাদেশিক কমিটি থেকে অগণতান্ত্রিক পন্থায় সম্পাদকের পদ থেকে অব্যহতি দেয় ও অন্যদিকে তিনি ১৯৪৮ সালে সরকারি নির্দেশে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে যান। দালাল-হালাল লাইনের পক্ষের কাউকে জেলা কমিটির সভায় সম্পাদক নির্বাচনের পদ্ধতি নিলে সেটাই হতো গণতান্ত্রিক। কমিউনিস্ট পার্টিতে আসার পর থেকেই নিচের কমিটির সম্পাদক পরিবর্তনের এই অগণতান্ত্রিক ধারাকে জীবনেও মানতে পারিনি। অথচ এই ধারাই কমিউনিস্ট আন্দোলনে এখনো শক্তিশালী। কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সি ঝিকরগাছা থানার পানিসর গ্রামে মসজিদের ইমামতি করে আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে গ্রেফতার হয়ে যান। কমরেড নূর জালাল, কমরেড আব্দুল হকসহ আরো কয়েকজন সদস্য গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুলিশি এই গ্রেফতার অভিযানের মধ্যেও কেশবপুরের পাঁজিয়া অঞ্চলের কমরেড অধীর ধরের বাগানে দুই দিন ব্যাপী জেলা কমিটির সভা হয়েছিল। জেলা কমিটির সদস্যদের খাবার কমরেড অধীর ধরের বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছিল। এই সময়কালে কমরেড আব্দুল হক সারা জেলায় সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়েছিলেন। যদিও তিনি কিছুদিনের মধ্যেই গ্রেফতার হয়ে যান। অল্প কিছু দিনের মধ্যে কমরেড নূর জালালও গ্রেফতার হয়েছিলেন। একদিকে কমরেডরা কারারুদ্ধ হলেন অন্যদিকে পার্টির বড় অংশ দেশ ত্যাগ করে চলে যান। পার্টির সংগঠনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা ও সংকট সৃষ্টি হয়।এই সময়ে বড়েন্দারের জ্ঞান সরকারকে সম্পাদক করে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। তারা কোনমতে পার্টির সংযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন। যেহেতু আমি কমরেড অমল সেন ও কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করছি সেক্ষেত্রে বাস্তব সত্য হলো ১৯৪৭-১৯৭১ এই ২৪ বছরের পাকিস্তানে কমরেড অমল সেন ১৯ বছরই পর্যায়ক্রমে কারারুদ্ধ ছিলেন। এই সময়কালে কারাগারের অভ্যন্তরে কমরেড অমল সেনের ভূমিকা ও কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতাদর্শ ও রাজনৈতিক বিতর্কে তার অবস্থান সম্পর্কে তিনি লিখে গেছেন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের বিকল্প শক্তি বইয়ে। এই বইয়ে যেহেতু কমরেড অমল সেন তার আদর্শগত রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে লিখে গেছেন সেক্ষেত্রে আমার নতুন করে তার মতামতের ক্ষেত্রে কিছু মূল্যায়ন করতে যাওয়া সমীচীন হবেনা। তবে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত কমরেড অমল সেনের বক্তব্যের কিছু শিক্ষণীয় দিক নিয়ে বলার চেষ্টা করছি।




