sliderমতামতশিরোনাম

কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন : পরিচ্ছেদ-৭

বিমল বিশ্বাস

আন্দোলন বৃত্তান্ত :

তেভাগা কৃষক আন্দোলনে কৃষক জনগণ বৃটিশ পুলিশ, জমিদার ও জোতদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই কৃষকেরা এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। আমি যখন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্কিত হই তার আগে থেকেই শুনেছিলাম কমরেড হেমন্ত সরকার জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীতে ছিলেন। এটা সত্য তো নয়ই বরং কমরেড হেমন্ত সরকারের বীরোচিত লড়াইয়ের ঘটনাকে আড়াল করবার জন্য শত্রæদের পক্ষ থেকে এই ধরনের কল্পকাহিনি প্রচারিত ছিল।

বড়েন্দার গ্রামের পূর্ব পাশে কাড়ার বিলে (ধোপাখোলা) জমিদারদের সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনী ঢাল-সড়কি নিয়ে কৃষকদের আক্রমণ করে তেভাগা আন্দোলনকে পরাজিত করবার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা নিয়েছিল। তখন কমরেড হেমন্ত সরকার জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান সর্দারকে পিছু হঠে মাঠ পরিত্যাগ করবার জন্যে আক্রমণ করেন। লাঠিয়াল বাহিনীর নেতা ছিলেন ঢাল-সড়কি, বল্লম নিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সবচেয়ে নামকরা লাঠিয়াল সর্দার। সেকারণে হেমন্ত সরকারের পিছু হঠে সরে পড়ার হুকুম মানতে যাবে কেন? ঐ লাঠিয়াল সর্দার কমরেড হেমন্ত সরকারকে এ কথাই বললেন, তুমি যদি লাঠি, সড়কি, বল্লমের আক্রমণে টিকে থাকতে পারো তাহলেই আমি পিছু হঠতে পারি। ঐ লাঠিয়াল সর্দারের চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করবার জন্যে সড়কি হাতে কমরেড হেমন্ত সরকার এগিয়ে যান। তখনি শুরু হয়ে গেল সড়কি, বল্লমের আক্রমণে একে অপরকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতা। উল্লেখ্য তেভাগা আন্দোলনের অঞ্চল গুলিতে যখনই পুলিশ ও জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর কোন আক্রমণ হতো তখনই ঢাক ও শঙ্ক বাজিয়ে কৃষক জনগণকে সংকেত দেওয়া হতো। যে সংকেতে কৃষক জনগণ প্রস্তুতি নিয়ে দ্রæততার সাথে শত্রুকে মোকাবেলা করতো। ঐদিনও যখন কমরেড হেমন্ত সরকার ও লাঠিয়াল সর্দারের লড়াই শুরু হয়ে গেল তখন ঢাক বাজাবার সাথে সাথে হাজার হাজার কৃষক জমায়েত হয়ে গেল। একবার কমরেড হেমন্ত সরকার সড়কি দিয়ে লাঠিয়াল সর্দারকে আক্রমণ করছে তখন লাঠিয়াল সর্দারও পাল্টা আক্রমণের মধ্য দিয়ে কমরেড হেমন্ত সরকারকে পরাভূত করবার চেষ্টা করছে। কয়েক ঘন্টা ব্যাপী এই জয়-পরাজয়ের মহড়ার মধ্য দিয়ে লাঠিয়াল সর্দার পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে যখন কমরেড হেমন্ত সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে জীবন বাঁচাবার জন্যে অনুরোধ করতে থাকে তখন কমরেড হেমন্ত সরকার লাঠিয়াল সর্দারকে জীবনেও আর জমিদারদের লাঠিয়াল হয়ে কৃষকদের উপরে আক্রমণে আসবেনা এই শর্তে ছেড়ে দেন। এই ঘটনার পরে সমস্ত এলাকায় রটে গেল হেমন্ত সরকারের ঘাড়ে মা-কালী ভর করেছিল বলেই লাঠিয়াল সর্দারকে পরাজিত করতে পেরেছে। কমরেড হেমন্ত সরকার বিশাল সাহসী ও শক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে জনগণের কাছে আবির্ভূত হলেন। তেভাগা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে কমরেড হেমন্ত সরকার যাত্রা শুরু করলেও এবারকার এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে গেলেন কৃষক আন্দোলনের পুরোভাগের অন্যতম নেতা। কমরেড হেমন্ত সরকার তেভাগা আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হলেন।
তেভাগা আন্দোলনের ঐ সময়কালে জমিদাররা লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তুলে যেমন অত্যাচারের পথ নিয়েছিল তেমনি কৃষক জনগণ ও জমিদার ও লাঠিয়ালদের বিচার করবার জন্যে বাহিরডাঙ্গা গ্রামে গড়ে তুলেছিল জজ কোর্ট। বড়েন্দারে গড়ে তুলেছিল হাই কোর্ট। জজকোর্ট ও হাইকোর্টে বিচারক ছিলেন কৃষক জনগণের প্রতিনিধিরা।

তেভাগা আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কাগদ্বীপ, বৃহত্তর দিনাজপুর, বৃহত্তর রংপুর বিশেষ করে নীলফামারী। এই সব অঞ্চলে কৃষকদের জীবন দিতে হয়েছিল, ব্যাপকহারে কারানির্যাতনের শিকার হয়েছিল। জালাও-পোড়াও এর হাত থেকেও রেহাই পায়নি। নীলফামারীর ডিমলা ও ডুমারের কৃষক আন্দোলনকে দমনকারী পরবর্তীতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান জাদু মিয়া কৃষকদের গুলি করে হত্যা করেছিলো। শুধু তাই নয় বর্বরোচিত পন্থায় কৃষক আন্দোলনকে দমন করেছিল। নড়াইলে তেভাগা আন্দোলনে সঠিক কৌশল গ্রহন করার কারনে তেভাগা আন্দোলনকে বিপর্যস্ত করতে পারিনি।
কিন্তু ১৯৪৮ সালে কমরেড রণদীভ এর বাম হঠকারী লাইন প্রয়োগ করতে গিয়ে নড়াইলেও কৃষক জনগণ ব্যাপক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিল। একথা উল্লেখ করার কারণ তেভাগা আন্দোলনের সাথে অনেকেই রণদীভের লাইনের আমলে অত্যাচারের যে স্টীম-রোলার চলেছিল তাকে গুলিয়ে ফেলেন।
চলবে/১৫

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button