নোয়াখালী প্রতিনিধি:পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু তাহেরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার এবং অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে অভিযান, বাড়িতে তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও মামলা দেওয়ার মাধ্যমে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করা হয়।
বর্তমানে ফেনীর ছাগলনাইয়া থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ আবু তাহের।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের (লোটাস কামাল) সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে আবু তাহের চাকরিজীবনে প্রভাব বিস্তার করতেন। তার চাচা আবুল কাশেম লালমাই উপজেলার বাঘমারা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ারম্যান ছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২০-২০২১ সালে তিনি মৌলভীবাজার জেলার গোপনীয় শাখায় (ডিআইও-১) দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২২ সালের অক্টোবরে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আলফাডাঙ্গায় দায়িত্ব পালনকালে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাড়িতে তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন মামলায় আসামি করার ঘটনা ঘটত। গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
আলফাডাঙ্গা পৌরসভা যুবদলের সদস্য সচিব ইমরান হোসেন অভিযোগ করেন, তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে থানায় মারধর করা হয় এবং পরে একটি ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় প্রধান আসামি করা হয়।
ইমরান হোসেন বলেন, আমাকে অন্যায়ভাবে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। থানায় নিয়ে মারধর করে আহত করা হয়। পরে একটি সাজানো ও মিথ্যা ককটেল বিস্ফোরণ মামলায় আমাকে প্রধান আসামি করা হয়। এই মামলাকে কেন্দ্র করে সাবেক ওসি আবু তাহের আলফাডাঙ্গা থানা থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাকে ‘এনকাউন্টার’ দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছিল। এ অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে এক দারোগার মাধ্যমে তার বাবার কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাশারুল বারীর অভিযোগ, আবু তাহেরের সময়ে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা সাজিয়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়।
বাশারুল বারী বলেন, ওসি আবু তাহের নিজেই ককটেল ফাটিয়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা ও গায়েবি বিস্ফোরক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করতেন। একটি মামলায় প্রায় ৪২ জনকে আসামি করা হয়েছিল। এরপর গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করেন তিনি। তার ভয়ে আমরা মাসের পর মাস রাতে নিজ বাড়িতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তাকে আলফাডাঙ্গা থানা থেকে বদলি করে ফরিদপুর অপরাধ শাখার ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমানে ফেনীর ছাগলনাইয়া থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ আবু তাহের। তার বিরুদ্ধে অতীত কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিতর্কিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পালন করছেন- এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে ছাগলনাইয়া এলাকায় গরু চুরি, ডাকাতি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ অবৈধ পণ্য প্রবেশের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, আমি যেখানেই চাকরি করেছি, সর্বোচ্চভাবে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমি কোনো ভুল করিনি।
বিস্ফোরক মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, সেখানে অনেকগুলো মামলা হয়েছিল।
তবে মামলা বাণিজ্য, অর্থ আদায় ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, ছাগলনাইয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবু তাহেরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তদন্তে সেগুলোর সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীরা আবু তাহেরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং দায় প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।