
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি: মাত্র ছয় বছর বয়স। এই বয়সে যখন আদর আর স্নেহে বিদ্যা অর্জনের কথা, তখন শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষকের হাতে স্কেলের নির্মম আঘাত সইতে হলো নার্সারি পড়ুয়া শিশু আহানাফকে। সম্প্রতি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার সেকেন্দার আলী মাদ্রাসায় ঘটা এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী পরিবার। বিচার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দ্বারস্থ হয়েছেন শিশুটির মা। অভিযোগ পেয়েই নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা প্রশাসন, ঘটনা খতিয়ে দেখতে দেওয়া হয়েছে তদন্তের নির্দেশ।
ভুক্তভোগী শিশুর মা মোসাঃ তানিয়া বেগম তার লিখিত অভিযোগে জানান, তার ছেলে আহানাফ (৬) আলফাডাঙ্গা সেকেন্দার আলী মাদ্রাসার নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ২৩ জুন (২০২৬) সকাল আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটে মাদ্রাসার শিক্ষক আরিফ মোল্লা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই শিশু আহানাফকে স্কেল দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন।
ছেলের মারধরের খবর পেয়ে মা তানিয়া বেগম তাৎক্ষণিক মাদ্রাসায় ছুটে যান এবং শিক্ষকদের কাছে ঘটনার কারণ জানতে চান। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, শুরুতে শিক্ষক আরিফ মোল্লা মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে সত্যতা যাচাইয়ের একপর্যায়ে তিনি স্কেল দিয়ে আঘাত করার কথা স্বীকার করেন। এ সময় জাহিদ নামের অপর এক শিক্ষক ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় রূঢ় আচরণ করেন এবং সন্তানকে নিয়ে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলেন।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই মাদ্রাসায় শিশুদের শারীরিক শাস্তির ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাইফুল্লাহ নামে অপর এক শিক্ষক শিশুটিকে মারধর করেছিলেন। সে সময় মাদ্রাসার মুহতামিম ইয়াসিনের কাছে আপত্তি জানালে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না বলে পরিবারকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফের একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অভিভাবকরা। তানিয়া বেগম জানান, বিনা অপরাধে তার কোমলমতি সন্তানের ওপর এমন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না। তার কাছে ঘটনার সাক্ষী-প্রমাণ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আরিফুজ্জামান মোল্লা বলেন, শিক্ষার্থীকে আমি স্কেল দিয়ে আঘাত করেছি এটা ঠিক। তবে তাকে মারধরের উদ্দেশ্যে নয়, শাসনের অংশ হিসেবেই আঘাত করা হয়েছে।
অন্যদিকে মাদ্রাসার মুহতামিম ইয়াসিন শিকদার বলেন, “ঘটনার বিষয়টি আমরা জেনেছি। শিশুদের প্রতি কোনো ধরনের নির্যাতন আমাদের নীতির পরিপন্থী। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি।
প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত নূর মৌসুমী বলেন, “এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হককে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে, ৬ বছরের শিশুর ওপর এমন অমানবিক আচরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য নিরাপদ, সহিংসতামুক্ত ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও উঠেছে।




