আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

আমার সংশয় এবং উদ্বেগ ছিল যথার্থই

কাজল ঘোষ
মেয়েটির প্রতি তারা ভালোভাবে সাড়া দিয়েছে এমনটি আমি দেখিনি। মেয়েটিকে তারা পছন্দ করেছে- এমনটা মনে হয়নি। আমি জুরিদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, কিছু মানুষের সুরক্ষার জন্য দণ্ডবিধি সৃষ্টি হয়নি। এটা আমাদের সবার জন্য। এই মেয়েটি একটি শিশু। মেয়েটিকে শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করা দরকার বিশেষত যারা তাকে গ্রাস করতে চায়। তারা এই মেয়েটির ওপর এটা ভেবে নির্যাতন করেছে যাতে তার কথা কেউ তোয়াক্কা না করে। সবশেষে আমরা একটি রায় পেয়েছি কিন্তু আমি নিশ্চিত নই, এই সাজা দোষীদের জন্য যথেষ্ট কিনা।
এই রায়ের পরে মেয়েটি লাপাত্তা হয়ে যায়। তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমি বেশ কিছু তদন্তকারীর সহায়তা চেয়েছি। এক্ষেত্রে আমি কিছু অসম্পূর্ণ রিপোর্ট পাই। সে রিপোর্টে বলা হয়- তাকে সানফ্রান্সিসকোর কোনো এক সড়কে পাচার করা হয়েছে। আমি কখনই এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমি তাকে আর কখনো দেখিনি।
এটা বলা কঠিন যে, পদ্ধতিগত জটিলতার ওজনের কতটা বিপরীতে আমরা। আমরা যদি এই শিশুটির নির্যাতনকারীদের জেলে পাঠাতে পারতাম তাহলে এর অর্থ এই দাঁড়াতো যে, তারা আর কোনো শিশুর ক্ষতি করতে পারতো না। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা কি পেলো? আমাদের বিচারব্যবস্থা মেয়েটিকে কতোটা সাহায্য করতে পেরেছে? সে যেই সন্ত্রাসের চক্রের মধ্যে পড়েছে তাকে কোনোভাবেই সার্বিক সহায়তা করছে না এই শাস্তি। এটা বাস্তবতা- এ সম্বন্ধে কি করা যেত। এ বিষয়টি ফিরে আসে মাথার ভেতর, কখনো কখনো আমার মনের ভেতর এ নিয়ে প্রশ্ন জাগে, কখনো আমার মগজের সামনেও এ প্রশ্ন আসে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও আমি এ বিষয়টি মাথায় নিতে পারতাম।
অ্যালামিদা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসে নয় বছর কাজ করার পর ১৯৯৮ সালে সান ফ্রান্সিসকো ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসে নিয়োগ পাই। আমি অপরাধ বিভাগে যুক্ত হই যেখানে প্রধান দায়িত্ব ছিল সিরিয়াল অপরাধী এবং সন্ত্রাস বিষয়ে কাজ করা। ওখানে কাজ করতে যেতে আমি প্রথমদিকে খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতাম। এর কারণ এটা না যে, আমি অ্যালামিদা কাউন্টি আদালতে কাজ করতে ভালোবাসতাম। সে সময় সান ফ্রান্সিসকো ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসের সুনাম সন্দেহজনক অবস্থায় রয়েছে। আমি এই অফিসের অকার্যকারিতার বিষয়ে সজাগ ছিলাম। একই সময়ে এটা ছিল আমার পদোন্নতি এবং আমার কাজ ছিল একটি ইউনিট পরিচালনা করা। একদল প্রসিকিউটরের তত্ত্বাবধান করা। এটা ছিল আমার জন্য বেড়ে ওঠার সুযোগ। উপরন্তু আমার বন্ধু এবং মেনটর ডিক ইগলেহার্ট সে সময় ছিল চিফ এসিস্ট্যান্ট ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি, যে আমাকে উৎসাহ দিয়ে আসছিল এখানে যোগ দেয়ার জন্য।
খুব সহসাই দেখতে পাই আমার যে সংশয় এবং উদ্বেগ তা ছিল যথার্থই। অফিসটি ছিল লেজেগোবরে। প্রতি দু’জন আইনজীবীর জন্য একটি কম্পিউটার ছিল। কোনো মামলার নথিপত্র খুঁজে পাওয়ার জন্য ছিল না কোনো ফাইলিং সিস্টেম অথবা কোনো ডাটাবেজ। কোনো একটি মামলা যখন শেষ হয়ে যেত তখনই এর ফাইলপত্র অ্যাটর্নিরা ময়লার ঝুলিতে ফেলে দিতেন। এটা ১৯৯০-এর দশকের শেষ ভাগের কথা। তখনো ঐ অফিসে কোনো ই-মেইল ছিল না।
সেখানে তীব্র মামলা জট, অসম্পন্ন তদন্ত এবং অনেক বিচার অনিষ্পন্ন ছিল। পুলিশি তদন্তের গাফিলতিতে আইনজীবীরা ছিল হতাশ। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নিদের প্রতি পুলিশও ছিল হতাশ। কারণ, অ্যাটর্নি অফিস মামলাগুলোর কোনো রায় দিতে ব্যর্থ হতো। সিদ্ধান্ত নেয়া হতো খেয়াল-খুশিমতো, ইচ্ছেমতো। স্টাফদের নৈতিকতা ছিল একদম সর্বনিম্ন পর্যায়ে। অনেককে চাকরিচ্যুত করার মধ্য দিয়ে পরিবেশটা আরো খারাপ করে তোলা হতো।
এক শুক্রবার চৌদ্দজন আইনজীবী লাঞ্চ শেষে ফিরে তাদের চেয়ারে দেখতে পান গোলাপি রঙের স্লিপ। এটা ছিল ধ্বংসাত্মক। সকলের কান্না এবং চিৎকার ছিল বিব্রতকর। একের পর এক আইনজীবী ভীত হয়ে পড়ে এবং সহকর্মীরা পেছন থেকে আঘাত করে চাকরিচ্যুত করতে পারে এই ভেবে সবাই চাকরি বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করতে থাকে। চাকরি হারিয়েছেন এমন কিছু মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে অনেকে, তাদের ভয় হলো যদি তারা উপস্থিত থাকে তাহলে তাদেরকেও বরখাস্ত করা হতে পারে।
কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি ‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে।
সুত্র : মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button