
আহমেদ জহুর : আজ মনীষী ড. প্রফেসর আহমদ শরীফের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরন করেন। তিনি ১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে পুষ্পাঞ্জলি। উপমহাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অসামান্য পণ্ডিত, অসাম্প্রদায়িক যুক্তিবাদী, দার্শনিক, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, মুক্তবুদ্ধির ও নির্মোহ চিন্তার এক অনন্য ধারক ছিলেন ড. আহমদ শরীফ।
#শুরুর_জীবন
প্রফেসর ড. আহমদ শরীফের জন্ম ১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সূচক্রদণ্ডীতে। পিতা আব্দুল আজিজ ও মাতা মিরাজ খাতুন। বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজিয়েট স্কুলের একজন করণিক। এ মুসলিম পরিবারের অন্দর মহলে শিক্ষার আলো ঢুকিয়েছিল উনিশ শতকেই। তাঁর ষষ্ঠ পূর্ব্বপুরুষ কাদের রজা সন্তানের জন্য কাজী দৌলতের সতী ময়না লোরচন্দ্রানী পুঁথিটি নিজ হাতে নকল করেছিলেন। তাঁর পিতামহ আইন উদ্দিন (১৮৪০ -১৯৩৭) ছিলেন সরকারি জজ কোর্টের নকল নবিস।
চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এন্ট্রাস পাস করা এবং বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন তাঁর কাকা ও পিতৃপ্রতিম। জন্মের পর থেকে আহমদ শরীফ সাহিত্যবিশারদ ও তাঁর স্ত্রীর কাছে পুত্রস্নেহে লালিত-পালিত হয়েছেন। ফলে অনেকের কাছেই তিনি সাহিত্য বিশারদের সন্তান হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁদের পিতা-পুত্রের এ সম্পর্ক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। ১৯৪৭ সালের ৭ নভেম্বর সালেহা মাহমুদের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি।
#শিক্ষা_দীক্ষা
ড. আহমদ শরীফ ১৯৩৮ সালে পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪০ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৪২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কৃতত্বের সঙ্গে স্নাতক পাস করেন। ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২য় বিভাগে ৪র্থ স্থান অধিকার করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে সৈয়দ সুলতান তাঁর গ্রন্থাবলী ও তাঁর যুগ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
#জীবন_জীবিকা
১৯৪৪ সালে আড়াইশ’ টাকার বেতনে গ্রিভেন্সিভ অফিসার হিসেবে দুর্নীতি দমন বিভাগে চাকরিতে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু। কিন্তু নীতিগত কারণে সেই চাকরি বেশিদিন করেননি। আসলে তাঁর রক্তের শিরায় প্রবাহিত ছিল শিক্ষকতার নেশা, ফলে তিনি ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস থেকে ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত লাকসামের পশ্চিমগাঁও নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের জুন পর্যন্ত ফেনী ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনায় কাটে আরো কিছুদিন। এরপর ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রিসার্চ অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি। চাকরির শর্ত ছিল যে, তিনি আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের বিশাল পুঁথি সম্ভার বিনা অর্থে দিয়ে দিবেন এবং তার বিনিময়ে ওই পুঁথি দেখভালের জন্য তাঁকে নিয়োগ করা হবে। এই শর্তের সূত্রেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার ছাড়পত্র লাভ করেন।
১৯৫২-৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে বাংলা বিভাগের অস্থায়ী লেকচারার এবং ১৯৫৭ সালে লেকচারার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬২ সাল থেকে তিনি সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপকও ছিলেন। ১৯৬৩ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সেকশনের পাশাপাশি অধ্যাপনায় যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৩ সালের ৩১ অক্টোবর চূড়ান্ত ভাবে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের ৩৬ বছরের সম্পর্ক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর। চাকরি জীবনে তিনি একাধিকবার আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ‘নজরুল অধ্যাপক পদে’ যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই পদে কর্মরত ছিলেন।
#সাহিত্যকৃতি
আহমদ শরীফ বড় হয়ে উঠেছিলেন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের দুর্লভ অমূল্য পুঁথির ভাণ্ডার ও সাময়িক পত্রপত্রিকার সম্ভারের মধ্যে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি ব্যয় করেছেন মধ্যযুগের সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য, যা ইতিহাসের অন্যতম দলিল। বিশ্লেষণাত্মক তথ্য, তত্ত্ব ও যুক্তিসমৃদ্ধ দীর্ঘ ভূমিকার মাধ্যমে তিনি মধ্যযুগের সমাজে ও সংস্কৃতির ইতিহাস বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে দিয়ে গেছেন, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর গাঁথা হয়ে থাকবে।
#গ্রন্থাবলি
তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা শতাধিক। প্রথম সম্পাদিতগ্রন্থ লায়লী মজনু ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৫৯ সালে মৌলিক গ্রন্থ বিচিত চিন্তা প্রকাশিত হয়। এছাড়া উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থ হলো–স্বদেশ চিন্তা, কালিক ভাবনা, যুগ যন্ত্রণা, বিশ শতকের বাঙালি, স্বদেশ অন্বেষা, মধ্যযুগের সাহিত্য সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, বাংলার সুফি সাহিত্য, বাঙালির চিন্তা-চেতনার বিবর্তন ধারা, বাংলার বিপ্লবী পটভূমি, এ শতকে আমাদের জীবনধারার রূপ রেখা, নির্বাচিত প্রবন্ধ, প্রত্যয় ও প্রত্যাশা, বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য (দুই খণ্ড)
সম্পাদনা-একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় (১৯৮৭) প্রভৃতি।
#অমিয়_দর্শন
ভাববাদ, মানবতাবাদ ও মাকর্সবাদের যৌগিক সমন্বয় প্রতিফলিত হয়েছিল তাঁর চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণে এবং বক্তব্য ও লেখনীতে। তাঁর রচিত শতাধিক গ্রন্থের প্রবন্ধসমূহে তিনি অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, বিশ্বাস ও সংস্কার পরিত্যাগ করেছিলেন ও আন্তরিকভাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন।
পঞ্চাশ দশক থেকে নব্বই দশকের শেষাবধি সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, দর্শন ও ইতিহাসসহ প্রায় সব বিষয়ে তিনি অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। দ্রোহী সমাজ পরিবর্তনকারীদের কাছে আজো তাঁর পুস্তকরাশির জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। তাঁর বিশাল পুস্তকরাশির মধ্যে যেমন মানুষের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক মুক্তির কথা রয়েছে তেমনি তৎকালীন পাকিস্তানের বেড়াজাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতা তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গঠিত ‘নিউক্লিয়াস’ (স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ)-এর সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৬৫ সালে তাঁর লেখা ‘ইতিহাসের ধারায় বাঙালি’ প্রবন্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ এবং ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটির কথা উল্লেখ ছিল। এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে তাঁর মৃত্যু অবধি তিনি দেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে কখনো এককভাবে, কখনো সম্মিলিতভাবে তা প্রশমনের জন্য মুক্ত মনে এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ। জন্মসূত্রে মুসলমান হলেও প্রথাগত কোন ধর্মের প্রতি তাঁর কোন আনগত্য ছিল না। এজন্য অনেকে তাঁকে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী ঘোষণা করেন। ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সক্রিয় ছিলেন।
#মরণোত্তর_দেহদান
১৯৯৫ সালে একটি উইলের মাধ্যমে তিনি মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করার কথা লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। সেই উইলে লেখা ছিল, ‘চক্ষু শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ, আর রক্ত হচ্ছে প্রাণ প্রতীক, কাজেই গোটা অঙ্গ কবরের কীটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাইতো বাঞ্ছনীয়’। উইল অনুযায়ী মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য দান করে দেয়া হয়। তাঁর স্মরণে ড. আহমদ শরীফ স্মৃতি পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রতি বছর এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
® আহমেদ জহুর,কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক




