
স্বীকৃতি বিশ্বাস,যশোর: পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে অভয়নগর থানা কমিটির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০ টায় নওয়াপাড়া নৌযান কার্যালয়ে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সংগঠনের অভয়নগর থানা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শ্রমিকনেতা আল আমিন শেখ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার শুরুতে আত্মোৎসর্গকারী শ্রমিক শ্রেণির বীর সৈনিকদের প্রতি দাড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের যশোর জেলা সভাপতি শ্রমিকনেতা আশুতোষ বিশ্বাস। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নড়াইল জেলা সাধারণ সম্পাদক কৃষকনেতা হুমায়ুন কবির। বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট অভয়নগর থানা সভাপতি মনিরুল ইসলাম বাবু, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এম আর টিটু, বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার এসোসিয়েশন বাঘাবাড়ি শাখা কমিটির সহ-সভাপতি ছোবহান মাস্টার, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ অভয়নগর থানা সহ-সভাপতি শ্রমিকনেতা সালাম মোল্লা, অভয়নগর উপজেলা নওয়াপাড়া পৌর রিক্সা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ শ্রমিকনেতা রহমত শেখ, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট শ্রীধরপুর ইউনিয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন শেখ, জাতীয় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ছাত্রনেতা দিলিপ বিশ্বাস প্রমুখ। সভাটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ অভয়নগর থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রমিকনেতা নাজমুল হুসাইন।
সভায় বক্তারা বলেন, মহান মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস পালনের শিক্ষার মৌলিক দিক হচ্ছে, শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ লড়াই-সংগ্রাম। ১৮৮৬ সালে এই আন্দোলন ছিলো শ্রমিকের কাজের দিনের কর্ম ঘণ্টার বৈধ নিয়ন্ত্রণ ও সুনির্দিষ্টকরণে ৮ ঘন্টা কাজ, ৮ ঘন্টা বিনোদন এবং ৮ ঘন্টা বিশ্রাম। এই দাবিতে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিক আন্দোলন সংঘটিত হলে সেই ন্যায্য দাবির আন্দোলন দমাতে তৎকালীন আমেরিকার শাসকগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালায়, সেই গুলিতে নিহত হয় শ্রমিক শ্রেণীর বীর সৈনিক নেতৃবৃন্দ এবং পরবর্তীতে বিচারের নামে অনেক নেতৃবৃন্দকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ঘটনা সারা পৃথিবীর শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। পৃথিবীর দেশে দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তার ফলে শাসকগোষ্ঠী এই দাবি সাধারণ রূপে মানতে বাধ্য হয়। সেই থেকে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অথচ আজকের বিশ্বে দাড়িয়ে আমরা দেখছি দাবিগুলো আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত হলেও পৃথিবীর দেশে দেশে এবং আমাদের দেশে এখনও এই দাবি অনেকাংশে বাস্তবায়ন হয়নি। এর একটিমাত্র কারণ, আর সেটি হচ্ছে প্রচলিত বিশ্বব্যবস্হা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্হা। এই ব্যবস্হা পরিবর্তনে শ্রমিক আন্দোলনকে আমরা এই শোষণমূলক বিশ্ব, রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্হার সামগ্রিক পরিবর্তনের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করতে না পারার দুর্বলতা। সেই সাথে আজ পৃথিবীব্যাপী বাজার পুনর্বণ্টন, প্রভাব বলয় বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধ সম্প্রসারিত হয়ে প্রযুক্তিযুদ্ধ,মুদ্রাযুদ্ধ, স্হানিক ও আঞ্চলিক যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ এমনকি মাবন সমাজ বিধ্বংসী পারমাণবিক যুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করে সামগ্রিক সংকট গভীর থেকে আরো গভীরতর করে চলেছে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আমেরিকা ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে আগ্রাসি যুদ্ধ পৃথিবীকে অস্হির করে তুলে চলেছে এবং এই যুদ্ধের সংকটের বোঝা বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণি, নিপীড়িত জাতি ও জনগণের ঘাঁড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাথে ভারত-রাশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সম্পাদিত “রেলোস সামরিক চুক্তি” আগামীতে এই অন্যায় যুদ্ধ আরো সম্প্রসারিত করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে সংঘটিত হওয়ার বিপদ বৃদ্ধি করেছে। এই চুক্তি সরাসরি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি আমেরিকার ইন্দোপ্যাসেফিক রণনীতির পাল্টা প্রস্তুতি হিসেবে সামনে আনছে। ফলে আগামীতে যুদ্ধ পরিস্থিতি এ অঞ্চলে সম্প্রসারিত হওয়ার গভীর সংকট সামনে আনছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণীর অর্থনৈতিক দাবির আন্দোলনের সাথে সাম্রাজ্যবাদ ও অন্যায় যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনকে অগ্রাধিকার ও অগ্রসর করতে হবে। সাথে সাথে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে, শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রীর ভিত্তিতে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্হা পরিবর্তন করে একটি শ্রমিক-কৃষকের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রাম অগ্রসর করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ পথই মুক্তির পথ, এই ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠার জন্য আজকের দিনে আত্মত্যাগ করেছিলেন শ্রমিক শ্রেণীর বীর সৈনিকেরা। ১৪১তম মহান মে দিবসে এটাই হোক আমাদের শপথ।
আলোচনা শেষে বেলা ১২ টায় একটি লাল পতাকা মিছিল নওয়াপাড়া নৌযান কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে নওয়াপাড়া পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে শেষ হয়।



