বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : টানা চার দিনের সংঘর্ষ, হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুরের পর অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল ফরিদপুরের বোয়ালমারী-সালথা উপজেলা সীমান্তের ময়েনদিয়া-খারদিয়া এলাকার মানুষ। দুই উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে বৈঠক করে দুইপক্ষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি টিকল মাত্র একদিন।
মীমাংসার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই বুধবার ফের হামলা-পাল্টা হামলা ও কুপিয়ে জখমের ঘটনায় রক্তাক্ত হয়েছে বোয়ালমারী-সালথা সীমান্ত। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধে এবার দুইপক্ষের দুই যুবক আহত হয়েছেন। এতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় আবারো বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হতে পারে।
তবে আজ বৃহস্পতিবার সাড়ে ৫টার দিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আবারো দুইপক্ষের উত্তেজনা শুরু হয়েছে।
টানা চারদিনের সংঘাতের পর মীমাংসা:
বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া বাজার এবং পাশের সালথা উপজেলার খারদিয়া এলাকা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুইপক্ষের বিরোধ চলে আসছে। বাজারের নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
গত শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত দফায় দফায় হামলা ও সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত তিনজনকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সোমবার সকালে ধুলজোড়া সেতু এলাকায় ফের সংঘর্ষের পাশাপাশি কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মঙ্গলবার রাতে বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুইপক্ষের লোকজনকে নিয়ে বৈঠক হয়। এতে দুই উপজেলার প্রশাসন, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সংঘাত বন্ধ করে এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দুইপক্ষকে সতর্ক করা হয়।
মীমাংসার পরদিনই ফের রক্তপাত :
কিন্তু বৈঠকের পরদিন বুধবার বিকেলেই ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরমেশ্বরদী এলাকায় জাকারিয়া নামে এক যুবককে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়ভাবে তিনি সালথার খারদিয়া গ্রামের মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
এর কিছুক্ষণ পর সিফাত নামে অপর এক যুবকও হামলার শিকার হন। স্থানীয়ভাবে তিনি ময়েনদিয়ার আবদুল মান্নান মাতুব্বরের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
পৃথক ঘটনায় দুই পক্ষের দুই যুবক আহত হওয়ায় এলাকায় আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। দুই ঘটনাতেই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তবে হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও পারিবারিক পুরোনো বিরোধে উত্তেজনা:
ময়েনদিয়া-খারদিয়া এলাকার বিরোধের পেছনে রয়েছে দুই পরিবারের পুরোনো দ্বন্দ্ব। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ময়েনদিয়ার আবদুল মান্নান মাতুব্বরের সঙ্গে খারদিয়ার মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের পরিবারের বিরোধ দীর্ঘদিনের। জিহাদের বাবা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি ছিলেন। ওই মামলায় আবদুল মান্নান মাতুব্বরকে প্রধান সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজাদ দেশে ফেরেন বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।
সময়ের সঙ্গে সেই পুরোনো পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় রাজনীতি, ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি। সীমান্তবর্তী হওয়ায় ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও রয়েছে। ফলে পুরোনো পারিবারিক দ্বন্দ্ব এখন বাজারকেন্দ্রিক আধিপত্যের বিরোধে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিরোধ আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পুরোনো পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ও বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে দুই পরিবারের বিরোধ, বাজার নিয়ন্ত্রণ কিংবা হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে স্থানীয়ভাবে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর সবকটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ :
মীমাংসার পরদিন ফের হামলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ‘হাছিবুল’ নামে এক ব্যক্তি ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, কয়েক দিনের সংঘাতের পর প্রশাসনের উদ্যোগে সমঝোতা হলেও পরদিনই খারদিয়ার এক যুবক হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং জয়পাশা বাজারসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও নিয়মিত টহলের দাবি জানান।
তবে ফেসবুক পোস্টে করা এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘আইন ভাঙলে কঠোর ব্যবস্থা’:
বোয়ালমারী থানার ওসি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার রাতে দুই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই পক্ষের সঙ্গে মীমাংসা বৈঠক হয়েছে। সেখানে দুই থানার রাজনৈতিক নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। কেউ আইন অমান্য করে পুনরায় হামলা বা সংঘাতে জড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জাকারিয়া আহত হওয়ার ঘটনায় অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মামলা হবে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। আগের সংঘর্ষের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দাবিরউদ্দিন বলেন, মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। বিরোধ নিরসনে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, আলোচনার মাধ্যমেও উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজন রয়েছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রাকিবুল হাসান বলেন, এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন সব সময় কাজ করছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী শান্