গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল হত্যা দিবসে দ্রুত বিচারের দাবি

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লীতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও তিন সাঁওতাল হত্যার ৪র্থ বার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার সাঁওতাল হত্যা দিবস পালিত হয়েছে। শোক র্যালি, শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মোমবাতি প্রজ্বলন ও বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্যে দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়।
সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, এএলআরডি ও জনউদ্যোগ গাইবান্ধা যৌথভাবে এসব কর্মসূচিগুলোর আয়োজন করে।
সকাল সাড়ে ৮টায় গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লী জয়পুর গ্রামে অস্থায়ী শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। পরে সাঁওতাল পল্লী জয়পুর ও মাদারপুর গ্রাম থেকে ব্যানার ও বিভিন্ন দাবি দাওয়া সম্বলিত ফেস্টুনসহ লোকজন এক বিশাল মিছিল নিয়ে সাড়ে ১২ কিলোমিটার সড়ক পারি দিয়ে গোবিন্দগঞ্জ শহীদ মিনারের বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেয়। সেখানে বেলা ১১টায় সমাবেশের শুরুতে শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে।
অনুষ্ঠিত সভায় বক্তারা মামলার দ্রুত বিচার দাবি করেন। মামলার বাদি সাঁওতাল নেতা থোমাস হেমব্রম বলেন, বিগত ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই গাইবান্ধা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার এই সাঁওতাল হত্যা মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে জমা দেন। কিন্তু দাখিলকৃত চার্জশিটে মূল ১১ জন আসামিদের নাম বাদ দেন।
সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাসকে বলেন, বিকল্প জায়গা থাকা স্বত্বেও কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল এখন আদিবাসীদের পৈত্রিক সম্পত্তির (কৃষি জমিতে) উপর তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প করার পায়তারা করছে। তাই তিনি এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাঁওতাল-বাঙালিসহ সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানান।
ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (সিআইডি) এর গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর হাসান জানান, মামলাটি তদন্তের জন্য গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের কাছে পিবিআই হস্তান্তর করেছে। বর্তমানে তা তদন্তাধীন আছে।
প্রসঙ্গত, সাঁওতাল ও বাঙালিদের এক হাজার ৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি ১৯৬২ সালে অধিগ্রহণ করে গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জস্থ রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার গড়ে তোলে। কিন্তু চিনিকল কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণের চুক্তি ভঙ্গ করে ওইসব জমি লিজ দিলে তাতে ধান-পাটসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। ফলে গত ২০১৫ সালে সাঁওতাল ও স্থানীয় কিছু বাঙালি অধিগ্রহণের চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে তাদের পূর্বপুরুষদের জমি ফেরত পেতে আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে গত ২০১৬ সালের ১ জুলাই ওই খামারের কিছু এলাকায় তারা চারটি বড়ো বসতি স্থাপন করে। পরে গত ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ওই খামারের বাকি জমিতে চাষ করা আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে নয়জন পুলিশ সদস্য তীরবিদ্ধ ও চার জন সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে তিন সাঁওতাল শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ মারা যান। পরে পুলিশ এক অভিযানে ওই বসতি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে। এইসব ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মুরমু বাদি হয়ে গত ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর ছয়শজনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করেন। পরে ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদি হয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান বুলবুল আহম্মেদসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং পাঁচশ থেকে ছয়শজনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে আরেকটি মামলা করেন।
ইত্তেফাক




