sliderস্থানিয়

ফারাক্কার লংমার্চের ৪৯ বছর পরও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা নদী যেন শুকনা চর

শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা: আজ ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী-এর নেতৃত্বে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক লংমার্চ। প্রায় পাঁচ দশক পর সেই আশঙ্কাই যেন বাস্তব রূপ নিয়েছে উত্তরাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ কয়েকটি জেলা । শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় পদ্মাসহ চারটি প্রধান নদী এখন মৃতপ্রায়; হুমকির মুখে কৃষি, জীববৈচিত্র ও নদীকেন্দ্রিক জনজীবন।ফারাক্কা ব্রীজ নির্মাণের পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে জেলার নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ। একসময় পানিতে টইটম্বুর থাকা পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পূনর্ভবা নদী এখন শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে; বিস্তীর্ণ চরজুড়ে দেখা দিয়েছে মরুকরণের চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পানিপ্রবাহ এখন অনেকটাই নির্ভর করে ভারতের পানি ছাড়ার সিদ্ধান্তের ওপর। আবার বর্ষায় হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে সৃষ্টি হয় বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙন।

পরিবেশবিদদের মতে, নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ, জলজ প্রাণী ও নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদনেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর চর এলাকার বাসিন্দা আনারুল ইসলাম বলেন, আগে পদ্মায় সারা বছর পানি থাকত। এখন শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে নদী পার হওয়া যায়। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ নেই, কাজও নেই। জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। একই এলাকার সামিউল আলম বলেন, বন্যার সময় নদী ভাঙে, খরা মৌসুমে আবার শুকিয়েও যায়। একদিকে জমি হারাই, অন্যদিকে পানির অভাবে ফসলও ঠিকমতো হয় না। চরাঞ্চলের জেলে রফিকুল ইসলাম জানান, একসময় পদ্মা থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন নদীতে পানি না থাকায় মাছও নেই। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাদিকুল ইসলাম বলেন, মওলানা ভাসানী যে উদ্দেশ্যে ফারাক্কার বিরুদ্ধে লংমার্চ করেছিলেন, আজও সেই সমস্যার সমাধান হয়নি। আমরা চাই নদীতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হোক।
নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক লুৎফুন নাহার লিনা বলেন, নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় জীববৈচিত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব বলেন, ফারাক্কা ব্রীজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে জেলার নদীগুলোর নাব্যতা কমে গেছে। বন্যা মৌসুমে যে পরিমাণ পানি পাওয়া যায়, তা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার ও পানি সংরক্ষণে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব থেকে উত্তরাঞ্চলের নদী ও জনপদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মওলানা ভাসানীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আন্তজার্তিক পর্যায়ে পানি কূটনীতি জোরদারের আহ্বানও উঠেছে। নদী বাঁচলে বাঁচবে কৃষি, জীববৈচিত্র ও নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button