Uncategorized

মতিউন নেছার ঘরে মানবতা কাঁদে

রাহুল সরকার : রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের রাজারামপুর এলাকার দলপাড়া। বিশাল পাড়ার বিশাল জনগোষ্ঠির মাঝে ঝুঁপড়ি ঘরে বসবাস মতিউন নেছার। স্বামী সেকেন্দার আলীর সম্পদ বলতে বাড়িভিটের মাত্র দু’শতক জমি। তাদের ঘরে জন্মেছেন তিন ছেলে। মহিউদ্দিন, মোকলেছার ও মহব্বত। দিন মজুরি করেই তাদের সংসার চলে। তার উপর মহিউদ্দিন ও মোকলেছারের বিয়ে হয়েছে। দিনমজুরির আয়ে তাদের নিজেরই চলেনা বাবা-মাকে দেখবেন কি। ফলে তারা পৃথকভাবে বসবাস শুরু করেন। আর ছোটছেলে মহব্বত বিয়েশাদী না করায় বাবা-মা’র পুরো দায়িত্বই পড়ে তার কাঁধে। এ অবস্থায় মাস ছয়েক আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সেকেন্দার আলী। একে তো সংসারের টানাটানি তার উপর স্বামীর মৃত্যু-এটা কিছুতেই সইতে পারছিলেননা মতিউন নেছা। নানা দুশ্চিন্তা ভর করায় মাসখানেক আগে তিনিও ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ফলে তার চলাফেরা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কথা বলার শক্তিও হারিয়ে যায়। এ অবস্থায় ছোট ছেলে মহব্বতও যেন বাকরূদ্ধ হয়ে পড়েন। একে তো পেটে খাবার নেই, থাকার ঘরটার চালা প্রতিনিয়ত খসে পড়ছে, তার উপর মায়ের চিকিৎসা- কিভাবে সম্ভব। এমনই হাজারো দুশ্চিন্তা তাকে অক্টোপাসের ন্যায় আঁকড়ে ধরেছে। মহব্বত পেটের ক্ষুধায় ও মায়ের চিকিৎসায় নানা স্থানে সাহায্যের জন্য ছুটোছুটি করেছেন কিন্তু কোন কাজ হয়নি। এমনকি জনপ্রতিনিধিরা খোঁজ পর্যন্ত নেননি।
সরেজমিন এলাকা পরিদর্শণকালে দেখা গেছে ঝুঁপড়ি ঘরের মেঝেতে মতিউন নেছা শুয়ে আছেন আর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছেন। ছোটছেলে মহব্বত দরজায় দাঁড়িয়ে শুধু এর ওর দিকে চাওয়া চাওয়ি করছেন। তার চেহারায় বার বার ভেসে উঠছিল এক কঠিন অসহায়ত্বের চিহ্নরেখা। সে যেন চিৎকার করে বলতে চাইছে আমার মায়ের মুখে খাবার দিতে চাই, মায়ের চিকিৎসা করাতে চাই, মাকে ভালো বিছানায় শোয়াতে চাই। কিন্তু সে তা’ বলতে পারছেনা। শুধু মায়ের মতই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে। এসময় কথা হয় বড়ছেলে মহিউদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন, বর্ষা মওসুমে আমন চারা রোপণের কাজ করেছি। এখন আর চারা রোপণের কাজ নেই। তাই নীচু এলাকায় জমে থাকা পানিতে মাছ শিকার করি। তিনি বলেন, সেই মাছ বিক্রি করে যা পাই তা’ দিয়ে সংসার চলেনা মা’র চিকিৎসা করি কিভাবে। তাই অনেকের কাছে সাহায্যের আবেদর করেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। এমনকি এলাকার জনপ্রতিনিধিরা খোঁজ নেয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি।
এসময় কথা হয় প্রতিবেশী মহসিন আলীর সাথে। তিনি বলেন, তাদের দুরবস্থা দেখে এলাকার লোকজন পালাক্রমে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এতে তাদের পেট চললেও চিকিৎসা তো চলছেনা। একারণে বিত্তবানদের উচিত তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। প্রতিবেশী শফিকুল ইসলাম বলেন, গণমাধ্যমে শোনা যায় এসব মানুষের সহযোগিতায় সরকার নানাবিধ কর্মসুচি হাতে নিয়েছে। কিন্তু মতিউনের ঘরে তার ছিটেফোঁটাও লাগছেনা।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম লালন বলেন, ভাই! মতিউনের ঘরে মানবতা কাঁদছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মহব্বতকে চালিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু তাতে খুব বেশি উপকার হচ্ছে বলে মনে হয়না। কারণ ঝুঁপড়ি ঘরটি জরুরী ভিত্তিতে মেরামত করা দরকার। তা’ না করতে পারলে তাদের থাকার জায়টুকুও হারিয়ে যাবে। তিনি বলেন, জায়গা আছে ঘর নেই- সরকারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে মতিউনের থাকার জায়গা পুরোপুরি নিরাপদ করা সম্ভব। এর পাশাপাশি তার সুচিকিৎসারও প্রয়োজন। তবে এবিষয়ে ইউপি মেম্বার আমিরুল ইসলাম কোন কথা বলতে রাজি হননি।
মধুপুর ইউপি চেয়ারম্যান আয়নাল হক বলেন, বিষয়টি জানা ছিলনা। বিষয়টি যেহেতু জানতে পারলাম তাই ওই নারীর জন্য যা যা করার দরকার তার সবই করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই ইউপি মেম্বারের ভূমিকায় মনে হচ্ছে তার মধ্যে মনুষ্যত্ব বলতে কিছু নেই।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার বাবুল চন্দ্র রায় বলেন, ওই নারীর জন্য কি করা যায় তা’ ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে পরামর্শক্রমে করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান বলেন, আপাততঃ সরকারিভাবে ঘর তৈরি করে দেয়ার মত সুযোগ নেই। তারপরও একটি লিখিত আবেদন দিলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button