উপমহাদেশশিরোনাম

দিল্লি শ্মশানের কলা খেয়ে বাঁচার চেষ্টা

খিদের জ্বালায় শ্মশান থেকে কলা কুড়িয়ে খাচ্ছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। দিল্লির নিগমবোধ শ্মশানের এই মর্মান্তিক ঘটনা চমকে দিয়েছে গোটা ভারতকে।
দুই দিন খাবার জোটেনি। একবেলা একটি গুরুদ্বারে কিছু খাবার পাওয়া গিয়েছিল। তাতে কি আর খিদে মেটে? তাই বেঁচে থাকার তাড়নায় ঘুরতে ঘুরতে শ্মশানে। সেখানেই শেষকৃত্য করতে আসার সময় কলা নিয়ে আসেন মৃতের পরিবার। লাশের ধর্মীয় সৎকারে যা ব্যবহার করে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হয়। ফেলে দেওয়া সেই কলা দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে খাচ্ছিলেন তিনজন পরিযায়ী শ্রমিক। পচা কলা বাছাই করে ব্যাগেও ঢোকাচ্ছিলেন। এ ভাবেই লকডাউনেরআবহে প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন দিল্লিতে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকরা।
শ্মশানের পচা কলা খেয়ে যে বিষক্রিয়ায় তারা মারা যেতে পারেন, সে বোধও এখন তাদের নেই। আগে পেটের আগুন নিভুক, তারপর ভাবা যাবে বাকি সব। কলা কুড়াতে কুড়াতে আলিগড় থেকে আসা এক শ্রমিকের বক্তব্য,‘কলা কয়েকদিন ঠিক থাকে। তাই কুড়িয়ে নিচ্ছি। খাওয়ার জন্য কিছু তো পাওয়া গেল!’
করোনার ফলে হঠাৎ করে লকডাউন হয়ে যাওয়ার পর এই বিপন্ন পরিযায়ী শ্রমিকদের কষ্টের অনেক ছবি এই কয়েক দিনে বার বার সামনে এসেছে। হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে তারা পথে মারা গিয়েছেন। উত্তর প্রদেশ সরকার কিছু বাসের ব্যবস্থা করায় হাজার হাজার শ্রমিক ঠাসাঠাসি করে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘরে ফিরেছেন। নিজের বাড়িতে পরিবারের কাছে গেলে তাও বাঁচবেন। মহানগরে কে তাদের সাহায্য করবে? যদিও লকডাউনের প্রথম পর্বে দিল্লিসহ বেশ কিছু রাজ্যের সরকার চেষ্টা করেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের আশ্রয় ও খাবার দিতে। শ্রমিকদের আশা ছিল ১৫ তারিখের পর তাঁরা বাড়ি ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু লকডাউন ওঠেনি। ৩ মে পর্যন্ত সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাতে কীভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে মুম্বইয়ে সে দৃশ্য দেখা গিয়েছে। সুরাট, হায়দরাবাদে হাজারো শ্রমিক বাড়ি ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছেন। দিল্লি দেখলো তাঁদের খিদের জ্বালা।
দিল্লিতে শ্রমিকদের অনেকগুলি শিবিরে রাখা হয়েছে। তার মধ্যে একটি শিবিরে দুই জনের মধ্যে প্রবল মারপিট হয়েছে। একটি শিবিরে আগুন লেগে গিয়েছে। আশ্যারয় হারিয়েছেন অনেকে। কোথাও আবার পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে শিবিরের ভিড় এড়িয়ে রাস্তায় শুয়েছেন শ্রমিকরা। তাদেরই একজন বেরিলি থেকে আসা ৫৫ বছরের জগদীশ কুমার। তাদের পরিস্থিতির কথা জানাজানি হওয়ার পরে দিল্লি সরকার একটি স্কুলে আবার সকলকে আশ্রয় দিয়েছে।
মনোসমাজবিদ মোহিত রণদীপ এর আগে জানিয়েছিলেন,‘এই ধরনের সংকটে লোকের বেপরোয়া হয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সুরক্ষার অভাববোধ থেকেই এটা হয়। প্রশাসন তাঁদের আশ্বাসবাণী শোনাচ্ছেন বটে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না।’
লকডাউন ৩ মে পর্যন্ত চললেও আগামী ২০ এপ্রিলের পর সরকার একটি সমীক্ষা চালাবে। যে সব জায়গায় করোনার প্রকোপ কম, সেখানে কিছু কিছু কাজে ছাড় দেওয়া হবে। মাঠে গিয়ে চাষের কাজ করা যাবে। শ্রমিকদের নিয়োগ করে ফসল তোলা যাবে। তা ছাড়া এসইজেড বা বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকায় কারখানা চালু করা যাবে। ই-কমার্স চালুর ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে। নির্মাণ ক্ষেত্রে কাজ শুরু হবে। বেশ কিছু কারখানাতেও কাজ করতে পারবেন শ্রমিকরা। বাড়ি ও রাস্তাঘাট তৈরির কাজ চলবে। গ্রামে গরিবদের জন্য একশ দিনের কাজ পুরোপুরি চালু হয়ে যাবে। শহরগুলিতে অবশ্য আগের মতোই লকডাউনের কড়াকড়ি থাকবে। কারণ, সবকটি বড় শহরই লাল এলাকায় পড়েছে। মানে সেখানে করোনার প্রকোপ বেশি। ফলে ২০ এপ্রিলের পরও তা অবরুদ্ধ থাকবে। তাই পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে আশার বার্তা নেই। তারা অধিকাংশই বড় শহরে আটকে পড়েছেন।
ভারতে এখন করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৮০। মারা গিয়েছেন ৪১৪ জন। প্রতিটি রাজ্যেই করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘন্টায় আগ্রায় ১৯ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। রাজস্থানে আক্রান্ত হয়েছেন ২৫ জন। তবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় এক নম্বরে মহারাষ্ট্র। তারপরেই দিল্লি। তাই দিল্লিতে কড়াকড়ি আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে। সূত্র : ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button