
ভুয়া সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দুটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
৭ জানুয়ারি খুলনার খালিশপুর থেকে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের, ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াডের টিম ৩ তাদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তাররা হলেন, এইচ এম এ বারিক ওরফে বাদল ওরফে বাদল হাওলাদার ওরফে মোস্তাক আহমেদ এবং তার স্ত্রী মরশিদা আফরীন। তাদের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরে। সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রের মূল হোতার বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সে সিআইডির নজরদারিতে রয়েছে। যে কোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে। গ্রেপ্তারদের দুই দিনের রিমান্ড শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার বেল সাড়ে ১১টায় সিআইডি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির ইকোনোমিক ক্রাইম স্কোয়াডের টিম ৩ এর দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফারুক হোসেন এসব তথ্য জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চক্রটি সঞ্চয়পত্রগুলো কীভাবে সংগ্রহ করে তা আমরা জানার চেষ্টা করছি। সঞ্চয়পত্রে নামের স্থানটি ফাঁকা থাকে। বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলে তারা। পরে ওই ফাঁকা সঞ্চয়পত্রে নাম বসিয়ে দেয়। যেহেতু ব্যাংকের ম্যানেজার এবং ক্রেডিট অফিসার জড়িত, তখন এই সঞ্চয়পত্র সঠিক কিনা তারা নিজেরাই তদন্ত করে। পরে তারা ক্লিয়ারেন্স রিপোর্ট সাবমিট করে যে সঞ্চয়পত্র সঠিক আছে। এরপরই তাদের নামে সঞ্চয়পত্রের মূল টাকার ৮০ ভাগ লোন হয়। এই লোনের টাকা তারা ক্যাশ আকারে তুলে নেয় এবং বিভিন্ন বিজনেসে বিনিয়োগ করে। এগুলো তখনই ভূয়া প্রমাণ হয়, যখন লোনের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও লোন যখন ফেরত দেয় না তখন নতুন করে সঞ্চয়পত্র সঠিক কি না তদন্ত শুরু হয়। তখন তারা বুঝতে পারে এটি ভুয়া সঞ্চয়পত্র। উন্নতমানের প্রিন্টারে এই ভুয়া সঞ্চয়পত্র প্রিন্ট দেওয়া হতো।’
এর আগে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘একটি সংঘবদ্ধ দলের ২১ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ঢাকার কয়েকটি ব্যাংকে একই ব্যক্তির একাধিক নাম ঠিকানা ব্যবহার করে বিভিন্ন নামসর্বস্ব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খুলে ভুয়া সঞ্চয়পত্র, এফডিআরের বিপরীতে স্বনামে-বেনামে ব্যাংক লোন নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা নিয়েছে বলে জানা যায়। ভুয়া সঞ্চয়পত্র দিয়ে ২১ টি ব্যাংক লোনের মাধ্যমে এ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিআইডির গ্রেপ্তার আসামি মোস্তাক ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান চালিয়ে অপরাধলব্ধ ২ কোটি টাকার অধিক অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তাদের নামে গুলশান-২ এ প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যে একটি ৯তলা বাড়ি, উত্তরায় শত কোটি টাকা মূল্যের ১টি ৬তলা বাড়ি, উত্তরখান এলাকায় কোটি টাকা মূল্যের একটি দোতলা বাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি ও জমির তথ্য পেয়েছে সিআইডি। মোস্তাক হাওলাদার একটি মামলায় আদালতের সাজা পরোয়ানাভুক্ত হয়ে প্রায় ১৬ বছর পলাতক ছিল। সে তার স্থায়ী ঠিকানার বসত-বাড়ি বিক্রি করে কিছুদিন ভারত ও মালয়শিয়ায় আত্মগোপনে ছিলেন। সে ২০১১ সালে দেশে ফিরে আবার প্রতারণা শুরু করে। ভুয়া সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক তার ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০০৪, ২০১১ ও ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশান, ধানমন্ডি, উত্তরা পশ্চিম ও মোহাম্মদপুর থানায় ৭টি মামলা দায়ের করে। মামলাগুলো সিআইডি তদন্ত করছে।’
তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদপুর থানায় ২০০৪ সালে এবি ব্যাংক বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় তিন মাস জেল খাটে মোস্তাক। এই চক্রের অন্যতম সদস্য এবি ব্যাংক ধানমন্ডি ব্রাঞ্চের তৎকালীন ম্যানেজার আসিরুল হক ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন জেল খেটে জামিনে মুক্ত হন। একই বছর সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আসিরুল হকের সহযোগী ছিলেন তার ক্রেডিট অফিসার। যিনি বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন। এবি ব্যাংকে তার চাকরি না থাকলেও ঢাকা শহরের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সে চাকরি করছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এই প্রতারক চক্রের মূল হোতাসহ অন্যান্য সহযোগীরা বর্তমানে শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ বড় ব্যবসায় যুক্ত আছেন। সিআইডি এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।’




