আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

জীবন বাজি রেখে ব্রিটেনে আসতে মরিয়া ভিয়েতনামীরা

ফ্রান্সের যে উপকূল থেকে ব্রিটেনে পাড়ি দিতে হয়, সেখান থেকে এক ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে বিবিসির লুসি উইলিয়ামসন দেখা পান জনা বারো ভিয়েতনামী পুরুষের।
আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে বসে চা খেতে খেতে এক ‘বসের’ ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা।
‘বস’ নামে পরিচিত এই আফগান মানব-পাচারকারী কাছের একটি লরি পার্কে ব্রিটেন-গামী লরিতে তাদের ঢুকিয়ে দেবেন।
এই ভিয়েতনামীদের একজনের নাম ডুক। লন্ডনে আসতে তিনি দেশেই এক পাচারকারীকে ৩০ হাজার ডলার দিয়েছেন। তাকে রাশিয়া, পোল্যান্ড, জার্মানি হয়ে ফ্রান্সের এই উপকূলের কাছে আনা হয়েছে।
বিবিসিকে ডুক বলেন, “ব্রিটেনে আমার কিছু ভিয়েতনামী বন্ধু আছে। যেতে পারলে তারা আমাকে কাজ জুটিয়ে দেবে।”
ফেরি টার্মিনালগুলোর কাছে লরির পার্কে নিরাপত্তা নজরদারি যতটা শক্ত এখানে ততটা নয়।
ফ্রান্সে আসার পর নানাভাবে এই অবৈধ অভিবাসীদের ব্রিটেনে ঢোকানোর চেষ্টা চলতে থাকে।
কেউ সফল হন, কেউ আবার মৃত্যুর মত ট্রাজেডির শিকার হন, যেমন হয়েছেন বুধবার ভোরে লরির ফ্রিজের ভেতর লুকিয়ে ব্রিটেনে ঢোকার পথে ৩৯ জন।
রয়টরস বার্তা সংস্থা বলছে বুধবার নিহত ৩৯ জনের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন ভিয়েতনামী নাগরিক। ভিয়েতনামীদের সংখ্যা আরো বেশিও হতে পারে।
ডুক জানায় সে ভিয়েতনাম থেকে লন্ডনে আসতে দালালকে ৩০হাজার ডলার দিয়েছে।
‘আমি মারা যাচ্ছি, আমি শ্বাস নিতে পারছি না’
ধারণা করা হচ্ছে, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ফাম থি ট্রা মাই নামে ২৬ বছরের এক ভিয়েতনামী তরুণী।
তার ভাই বিবিসিকে বলেছেন মঙ্গলবার রাত সাড়ে দশটায় শেষবার তার বোন দেশে তার মায়ের কাছে একটি টেক্সট বার্তা পাঠিয়েছিল।
বার্তাটি ছিল এরকম – “বাবা-মা আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই। বিদেশে আসার চেষ্টায় আমি ব্যর্থ হয়েছি। আমি মারা যাচ্ছি, আমি শ্বাস নিতে পারছি না। আমি তোমাদের ভালবাসি, আমি দুঃখিত।”
ফাম থি ট্রা মাইয়ের মত হাজার হাজার ভিয়েতনামী জীবন বাজি রেখে একটু ভালো জীবনের আশায় দালালকে বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে ইউরোপে রওয়ানা হচ্ছেন। অধিকাংশের গন্তব্য ব্রিটেন।
এক হিসাবে, ভিয়েতনাম থেকে প্রতি বছর ১৮,০০০ নারী-পুরুষ অবৈধ উপায়ে ইউরোপের পথে রওয়ানা দেয়।
জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, ভিয়েতনাম থেকে মানুষ পাচার করে দালালরা প্রতি বছর ৩০ কোটি ডলার আয় করে।
ফ্রান্সের উপকূলে একটি জায়গায় অবৈধ ভিয়েতনামি অভিবাসীরা অবসর কাটাচ্ছে।
কেন ব্রিটেন এক নম্বর গন্তব্য
বিবিসি ভিয়েতনাম সার্ভিসের কুইন লে বলছেন, প্রধানত অর্থনৈতিক কারণেই চরম ঝুঁকি নিয়ে প্রচুর অর্থ দালালকে দিয়ে হাজার হাজার ভিয়েতনামী ইউরোপের পথে পা বাড়াচ্ছে।
যারা আসছে তারা দেশে কায়িক পরিশ্রম করে জীবন যাপন করে।
তাহলে কীভাবে তারা ২৫ থেকে ৩০ হাজার পাউন্ড জোগাড় করছে?
কুইন লে বলছেন, আত্মীয় বন্ধুদের কাছ থেকে ধার-দেনা, চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অর্থ জোগাড় করতে হয়।
বিবিসি ভিয়েতনাম বিভাগের প্রধান জ্যাং নুয়েন বলছেন, অবৈধ ভিয়েতনামীরা সাধারণত ব্রিটেনের নেইল বা নখের পার্লার এবং চীনা বা ভিয়েতনামী রেস্তোঁরায় কাজ করে।
ভিয়েতনামের পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে সাধারণ কায়িক পরিশ্রম করে বছরে বড় জোর ৭০০ থেকে ১০০০ পাউন্ড রোজগার করা সম্ভব।
কিন্তু ব্রিটেনে ঢুকতে পারলে এক মাসেই তাদের পক্ষে সেই টাকা আয় করা সম্ভব।
ফাম থি ট্রা মাই এবং এনগুয়েন লুওনের স্বজনরা আশংকা করছেন এরা দুজনও হয়ত লরিতে করে ব্রিটেন আসতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন
ব্রিটেনে ঢোকার রুট
গবেষণায় দেখা গছে, দালালরা দুভাবে মানুষকে ব্রিটেনে ঢোকায়।
এক. প্রিমিয়াম সার্ভিস – যে পথে ঘুর কম এবং ঝুঁকি কম, কিন্তু দালালকে পয়সা দিতে হয় অনেক। যারা এই পথ নেয় তাদেরকে শেংগেন বাণিজ্য ভিসার ব্যবস্থা করে সরাসরি বিমানে করে প্যারিসে আনা হয়। সেখানে তাদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে সুযোগ বুঝে ব্রিটেনে পাচার করা হয়।
দুই. অপেক্ষকৃত কম পয়সা দিয়ে যারা আসেন তাদের অনেক সময় লাগে, এমনকী কয়েক মাস।
সাধারণত ভিয়েতনাম থেকে তাদের বিমানে মস্কোতে আনা হয়। সেখান থেকে ট্রেনে বা লরিতে কয়েকটি দেশের ওপর দিয়ে গোপনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশে আনা হয়। তারপর ফ্রান্সের একটি ফেরি টার্মিনালে এনে মালবাহী ট্রাকের খুপরিতে বা মালের ভেতর ঢুকিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পার করে ব্রিটেনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
ফ্রান্সে ঢোকার আগে তাদের অনেক সময় আধা ডজন দেশ পাড়ি দিতে হয় – বেলারুশ, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, স্লোভাকিয়া, জার্মানি এবং সর্বশেষে ফ্রান্স।
অনেক সময় এসব দেশে থাকার সময় দালালের জন্য পয়সা জোগাড় করতে সেখানেই নামমাত্র মজুরিতে নির্যাতন সহ্য করে কাজ করার চেষ্টা করে এসব অবৈধ অভিবাসী।
সূত্র : বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button