শিরোনামশীর্ষ সংবাদ

বন্যার কারণে আগেই বেচে দিচ্ছেন কোরবানির গরু

যে প্রধান সড়কে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন সেই রাস্তার প্রায় দেড়শ ফুট ভেঙে কসিরনের বাড়িঘর বসতভিটা সব তছনছ হয়ে গেছে। কসিরন বেগমের বাড়ি যেখানে ছিল সেখানে এখনো অথৈ পানি।

তিনি বলছিলেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। চারটা ঘর গেল। এক কাপড়ে ঘর থেকে বার হইছি। কিচ্ছু আনার পারি নাই।”

এক রাস্তা ভেঙে কসিরন বেগমের মতো ঘরবাড়ি বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন ১৮টি পরিবার।

গাইবান্ধায় এবার বন্যায় ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৩ হাজার ঘরবাড়ি।

.
সরকারি হিসেবেই সারাদেশে অন্তত ২৮টি জেলা প্লাবিত হয়ে লাখ লাখ মানুষ এবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শতাধিক মানুষের মৃত্যু ছাড়াও ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ফসলি জমি, মাছের খামার ভেসে গেছে বন্যায়। হাঁস-মুরগি আর গবাদি পশুর খামারিরাও হয়েছেন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত।

গাইবান্ধার এক পশুর হাটে কোরবানির গরু নিয়ে আসা শাজাহান বলছিলেন বন্যায় গোখাদ্যের চরম সংকট তৈরি হয়েছে।

১০-১২দিন টানা রাস্তায় থাকার পর বাধ্য হয়ে গরু হাটে এনেছেন তিনি। বলছিলেন, ঈদের দু’তিনদিন আগে তার পালের গরুটি বেচার ইচ্ছা ছিল। বন্যার কারণে আগেই বেচতে বাধ্য হচ্ছেন, কিন্তু বিক্রি হবে কিনা নিশ্চিত নয়।

“এখনো রাস্তায় আছি। বাড়ির মধ্যে পানি শুকায়নি। গরুকে তো খানাদানা দিতে পারি না। এজন্যই নিয়ে আইছি। বন্যার কারণে গরুর শরীল শুকায় গেছে। আগে ৮০-৯০ হাজার দাম উঠছে, এখন বলছে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার।”

এবার বন্যায় শাহজানের মতো বহু মানুষকে বাড়ির গবাদি পশু নিয়ে রাস্তাঘাট কিংবা উঁচু বাধে আশ্রয় নিতে হয়েছে।

২২টি গরু ছাগল ও ভেড়ার একটি পাল নিয়ে নদীর তীরে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে জুলহক ইসলাম। বন্যায় তার একটি গরু মারা গেছে।

.
“এই গরু-বাছুরই আমার সম্পদ। মনে করেন চরে নিয়ে গেছি, ঘাস পাতা খাওয়াইছি। এখন তো বন্যায় চরও তলায় গেছে। এখন এই পল (খড়ের গাদা) আছে একটু করে দিই কোনোরকম জীবনটা বাঁচুক।”

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন জানায় এবারই প্রথম ত্রাণের সঙ্গে দেয়া হয়েছে গোখাদ্য। বন্যার পানি নামলেও এখনো নিজের বসতভিটায় ফিরতে পারেননি এমন বহু মানুষ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। উদাখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়া অনেকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের অভিযোগ একটি চাপকল ছাড়া ত্রাণ সাহায্য মেলেনি সেখানে।

দুর্গত এলাকার প্রবীণ নারী পুরুষরা বলছেন, তাদের বাড়িতে এবার ১৯৮৮ সালের বন্যার চেয়েও বেশি পানি উঠেছে।

ষাটোর্ধ তুলি বেগম বলেন, “পাঁচদিন বন্যার পানি খাইছি। পানি কোথায় পাব।”

চার সন্তান ও স্বামীর সাথে দুই সপ্তাহ ধরে তাঁবু টানিয়ে আছেন আজেনা বেগম। তার ভাষায়, “বাথরুম তো নাই-ই। পানির কষ্ট, খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট, শোবার কষ্ট…”

কসিরন বেগম।
                 কসিরন বেগম।

মর্জিনা বেগম নামের আরেকজন নারী বলেন, “আগে এত পানি দেখি নাই আর এত ক্ষতিও হয় নাই। মানুষির এবার মেলা জিনিস ক্ষতি হলো। ধান চাউল যা আছিলো আইনবারও পারি নাই।”

বাঁধে আশ্রয় নেয়া অধিকাংশেরই অভিযোগ তারা কোনো ত্রাণ সহায়তা পাননি। তবে স্থানীয় মেম্বার একটি টিউবওয়েল বসিয়ে দিয়েছেন।

ত্রাণ যে সবাইকে দেয়া যাচ্ছে না সেটি স্বীকার করেছেন উড়ীয়া ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মোহাম্মদ হায়দার আলী। এদিন ২৫টি পরিবারের জন্য বরাদ্দ ১০ কেজি করে চাল ৫০টি পরিবারের মধ্যে পাঁচ কেজি করে ভাগ করে দিচ্ছিলেন তিনি।

“উপজেলা থেকে দুইবার শুকনা খাবার পাইছিলাম দুইশ দুইশ চারশো ব্যাগ। কিন্তু মানুষ প্রায় সাড়ে চার হাজার। আর ২৫টি পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে চাল পাইছি ৬ বার। ব্যাপক চাহিদা। সবারই তো ধান তলায় গেছে। কারো চাইল নাই। এখন গেরস্তরা এসেও ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে, যেহেতু তাদের ধান চাইল ডুবে গেছে, কিন্তু আমরা তো সেটার চাহিদা মেটাতে পারবার লাগছি না।”

গাইবান্ধা জেলায় এবার ৩৬টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে বন্যার পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। জেলার প্রায় ৬ লাখ মানুষ হয়ে পড়ে পানিবন্দী। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬৩ হাজার ঘরবাড়ি। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ১৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল।

শুধু গাইবান্ধাই নয় এবার সারাদেশের বন্যার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক। প্লাবিত হয়েছে অন্তত ২৮টি জেলা। প্রাণহানি ঘটেছে অন্তত ১১৯ জনের।

গরুকে খাওয়ানোর ঘাসও নেই কোথাও।
গরুকে খাওয়ানোর ঘাসও নেই কোথাও।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেবে প্রায় ৬১ লাখ মানুষ এবার পানিবন্দী হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি ঘরবাড়ি আর ১ লক্ষ ৫৪ হাজার একর ফসলি জমি। বন্যায় ক্ষতির তালিকায় ৪ হাজার ৯শ ৩৯টি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ৭ হাজার ২৭ কিলোমিটার সড়ক, ২৯৭টি ব্রিজ-কালভার্ট ও ৪৯৫ কিলোমিটার বাঁধ।

এবছর বন্যায় দেশব্যাপী ১ লক্ষ ৫৪ হাজার একর ফসলী জমি তলিয়েছে। আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বহু কৃষক যাদের একজন গাইবান্ধার মোফাজ্জল হোসেন।

মাঠের পানি নেমে যাওয়ায় নতুন করে এবার রোপা আমনের বীজ ফেলছিলেন তিনি। ৫ বিঘা জমিতে আবাদ করেন মি. হোসেন।

“সরকারি লোকে তো বলতেছে আমরা বীজ দেব, বিনামূল্যে সার দেব। কই আমরা তো পাই না!”

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মতিন দাবি করেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক, কোনো সমস্যা নেই। পুনর্বাসন প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, এবার গোখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। এটা কিন্তু আগে ছিল না।

“শিশু খাদ্যও সরকার দিয়েছে। যাদের ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি মেরামত করে দেয়া হবে। যাদের ফসলি জমি নষ্ট হয়ে গেছে তাদেরকে প্রয়োজনীয় বীজ সরবরাহ করা হবে। যাদের মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সহায়তা দেয়া হবে।”

দুর্গত মানুষের জন্য সরকারি নানারকম বরাদ্দ থাকলেও প্রশ্ন রয়েছে তার সবটা সময়মতো দুর্গতদের কাছে পৌঁছায় কিনা। বন্যার সময় সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু পানি কমার পরে যে সংকট শুরু হয় সেটি থেকে যায় অনেকটা আড়ালে। যে কারণে ঘরবাড়ি আর ফসল হারানো অসহায় মানুষের জন্য বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনটাই বেশি জরুরি।

বন্যা থেকে বাঁচতে ভাসমান শস্য চাষ হচ্ছে বাংলাদেশে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button