বিবিধশিরোনাম

দিনাজপুরে ‘প্রাণীখেকো উদ্ভিদের’ সন্ধান

তিন মাস চেষ্টার পর অবশেষে দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সন্ধান পেয়েছেন প্রায় বিলুপ্ত ‘প্রাণীখেকো’ উদ্ভিদের। এটির নাম ‘সূর্যশিশির’। এক বীজপত্রী মাংসাশী উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম Drosera Rotundifolia. উদ্ভিদটি পতঙ্গকে অর্থাৎ প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। নিজ ক্যাম্পাসে এমন উদ্ভিদের সন্ধান পেয়ে আনন্দিত ও গর্বিত সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের এমএসসি শেষ পর্বের ছাত্র মোসাদ্দেক হোসেন জানান, ২০১৬ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যাদুঘরে জীববিজ্ঞান গ্যালারিতে এই সূর্যশিশির উদ্ভিটটি সম্পর্কে জানতে পারি। এটি শুধু দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলেই জন্মায়। এরপর বিভিন্ন স্থানে এই উদ্ভিদটি খোঁজার চেষ্টা করি। সর্বশেষ গত ১৫ জানুয়ারি দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগিতায় নিজ কলেজ ক্যাম্পাসেই এই উদ্ভিদটির সন্ধান পাই।
তিনি বলেন, রূপকথার গল্পে মানুষ খেকো গাছ বা প্রাণীখেকো উদ্ভিদের কথা শুনেছি। কিন্তু নিজ ক্যাম্পাসেই বাস্তবে একটি উদ্ভিদের পোকা খাওয়ার দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এটি নিয়ে কাজ করার এবং হাতে কলমে শিক্ষালাভের একটি বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হলো এই উদ্ভিদটি পেয়ে।
উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী হাফিজা ইসলাম হ্যাপী জানান, আমরা খুবই গর্বিত যে আমাদের ক্যাম্পাসে এরকম একটি পতঙ্গখেকো উদ্ভিদ আমরা পেয়েছি। পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি নিজ ক্যাম্পাসেই পতঙ্গখেকো উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়ে নিজেদের ধন্য মনে করছি।
দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. ফিরোজ জানান, প্রাণীখেকো এই ধরনের বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। তিনি জানান, পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি হাতে-কলমে এই উদ্ভিদ নিয়ে শিক্ষার্জন করতে পারবেন তারা। যা উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র নিয়ে শিক্ষালাভে সবার জন্য সহায়ক হবে।
দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন জানান, আমি যখন দিনাজপুর সরকারী কলেজের ছাত্রছিলাম তখন আমার প্রিয় সার রজব আলী মোল্লা এই সূর্যশিশির উদ্ভিদের সাথে আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেন, তা ২৫ বছর আগে। আজ আমি একই বিভাগের শিক্ষক হয়ে আমার ছাত্র ছাত্রীদের এই সূর্যশিশির উদ্ভিদের পরিচয় করিয়ে কথা চিন্তা করে প্রায় তিন মাস ধরে সন্ধানের পর ক্যাম্পাসের উত্তরদিকে পরিত্যক্ত ভূমিতে এই উদ্ভিদগুলোর সন্ধান পাই।
তিনি জানান, এই মাংসাশী উদ্ভিদের মধ্যে এই প্রজাতি সবচেয়ে বড়। ৪-৫ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট গোলাকার থ্যালাস সাদৃশ্য উদ্ভিদটির মধ্য থেকে একটি লাল বর্ণের ২-৩টি লম্বা পুষ্পমঞ্জুরি হয়। ১৫-২০টি তিন থেকে চার স্তরের পাতা সাদৃশ্য মাংসল দেহের চারদিকে পিন আকৃতির কাঁটা থাকে। মাংসল দেহের মধ্যভাগ অনেকটা চামচের মতো ঢালু এবং পাতাগুলোতে মিউসিলেজ সাবস্টেন্স নামক একপ্রকার এনজাইম (আঠা) নিঃসৃত হয়। সুগন্ধ আর উজ্জ্বলতায় আকৃষ্ট হয়ে পোকা বা পতঙ্গ উদ্ভিদটিতে পড়লে এনজাইমের আঠার মাঝে আটকে যায় এবং পতঙ্গ নড়াচড়া করলে মাংসল পাতার চারদিকে পিনগুলো বেকে পোকার শরীরে ফুড়ে গিয়ে পোকাকে ধরে ফেলে। এভাবেই এই উদ্ভিদটি পোকা বা পতঙ্গকে খেয়ে ফেলে।
দিনাজপুর সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসার সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন বলেন, উদ্ধিদ বিভাগের শিক্ষকের নিকট থেকে জেনেছি এই সূর্যশিশির নামক উদ্ভিদটি পোকা খেয়ে ফেলে। এই ধরনের ঘটনা সচারচর দেখা পাওয়া যায় না। এই সূর্যশিশির উদ্ভিদটি উপর যখন কোন পোকা মাকড় এসে বসে তখনই এই উদ্ভিদটি তার পালক দ্বারা জড়িয়ে ধরে ভক্ষন করে। এই সূর্যশিশির উদ্ভিদটি এক সময় ক্যাম্পাসে অনেক ছিল। এখন তুলনামুলক ভাবে অনেক কমে গেছে। তবে উদ্ভিদটিকে যদি সংরক্ষণ করা না যায় এক সময় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পূর্বপশ্চিম।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button