বিবিধশিরোনাম

নারী-পুরুষ সবার জন্যই রাইডার শাহনাজ

সমাজে এত পেশা থাকতে জীবিকা হিসেবে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং বেছে নিয়েছেন রাজধানীর মিরপুর সাড়ে ১১ নিবাসী শাহনাজ আক্তার পুতুল। রাতেও অনায়সে যাত্রী পরিবহন করেন জীবন সংগ্রামী এই নারী।
প্রায় ২ মাস ধরে স্মার্টফোনের অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মোটরবাইক চালাচ্ছেন শাহনাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে তিনি এরই মধ্যে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
গতকাল রোববার (১৩ জানুয়ারি) বাংলা’র কার্যালয়ে কথা হয় শাহনাজ আক্তারের সঙ্গে।
কেমন আছেন?
শাহনাজ : আপনাদের দোয়ায় ভাল আছি। অনেক সংগ্রামের মধ্যেও সকলের সহায়তা আমার আগামীর পথচলার জন্য একমাত্র অবলম্বন।
এত কাজ থাকতেও রাইড শেয়ারিং করে জীবিকা নির্বাহ করছেন কেন?
শাহনাজ : কৈশোরে মিরপুরের এক ছেলেকে বিয়ে করি ২০০০ সালে। কিন্তু দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি, ছাড়াছাড়িও হয়নি। এ নিয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে চাই না। দুই মেয়েকে নিয়ে মা–বোনদের সহায়তায় দিন যাচ্ছিল তার। এক মেয়ে নবম, আর এক মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। খুবই কষ্টে দিন যাচ্ছিল। অগত্যা বাইক নিয়ে পথে নেমে পড়ি জীবনসংগ্রামে।
শুধু মেয়েদের জন্যও তো রাইড শেয়ার করতে পারতেন? যেমন ওবোন। কিন্তু নারী-পুরুষ সবার জন্যই রাইড শেয়ারিং বেছে নিলেন কেন?
শাহনাজ : আমিও তো মানুষ। ছেলেদের সাথে আমাদের শুধু দৈহিক গঠনে কিছু ফারাক আছে, আর বাকি কিছুতে তো নেই। তাই ছেলেরা যা করতে পারে আমি তা কেন করতে পারব না?
সংসার সামলে বাইক কখন চালান?
শাহনাজ : সকালবেলা বাইক নিয়ে বের হতে পারি না। দুই মেয়েকে স্কুলে নেওয়া, খাবার তৈরিসহ বিভিন্ন কাজ সেরে মায়ের বাসায় মেয়েদের রেখে কাজে বের হতে দুই–তিনটা বেজে যায়। তবে প্রতিদিনই সব খরচ বাদে পাঁচ থেকে ছয় শ টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারি।
রাস্তায় বাইক নিয়ে বের হলে বা পুরুষদের রাইড শেয়ারিং করলে আশেপাশের মানুষ কেমন চোখে দেখে?
শাহনাজ : রাস্তায় যখন মোটরবাইক নিয়ে বের হই, পেছনে পুরুষ যাত্রী থাকে, তখন মানুষ হাসে। কিন্তু মানুষের হাসি দেখলে তো আর আমার সংসার চলবে না।
প্রতিদিন এমন অনেক অভিজ্ঞতা হয়, আগে মন খারাপ হতো, ভাবতাম, ছেড়ে দিবো। কিন্তু আমাকে তো রোজগার করতে হবে, আমার দুইটা মেয়ে, মেয়েদেরকে আমাকেই পড়াশুনা করিয়ে মানুষ করতে হবে! মেয়েরা চাইলে পাঁচ মিনিটে হাজার টাকা কামাই করতে পারে, কিন্তু আমি ঐ লাইনে যাবো না, আমি সম্মানের সাথে রোজগার করি।
পুলিশ ট্র্যাফিক, সার্জেন্ট কেমন ব্যবহার করে?
শাহনাজ : ওরা খুব ভালো। আমাকে পারলে স্যালুট দেয়। আমি রুলস ব্রেক করি না।
বড় মেয়ে ক্লাশ নাইনে পড়ে। আমাকে নিয়ে ও অনেক গর্ব করে, ফেসবুকে আমাকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়। আমি অসুস্থ থাকলে বলে, ‘‘আম্মু আজকে আমি বাইক নিয়ে বের হই’’। আমি আমার মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য সবকিছু করতে পারি তবে তা অবশ্যই সৎ পথে।
বাজে কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি?
শাহনাজ : যাত্রীরা শিক্ষিত–ভদ্র হওয়ায় এখন পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। ভাইয়ারা সবাই খুবই ভাল করছেন। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ রাইড ক্যানসেল করে দেন। আমার অনুরোধ, নারী বলে আমার রাইড কেউ ক্যানসেল করবেন না।
শাহনাজ সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। প্রতিদিনই সব খরচ বাদে পাঁচ থেকে ছয় শ টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন। এ টাকা দিয়ে দৈনন্দিন সংসার খরচ করে ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ঘরভাড়া, দুই মেয়ের পড়াশোনা, খাবার সব মিলিয়ে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। তাই শাহনাজ একটি স্থায়ী চাকরি করতে চান।
বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button