জাতীয়শিরোনাম

ভূতুড়ে শহর রাঙ্গামাটি

রাঙ্গামাটির দীপালি চাকমার বাড়ি ভেসে গেছে পাহাড়ি ঢলে। কোনোভাবে তার পরিবার প্রাণে বেঁচে গেলেও পাশের বাড়ির রুলি চাকমা ও তার স্ত্রী নিরুপমা দেওয়ান এ দুজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মঙ্গলবার থেকে। নিজের বেঁচে থাকার চাইতে তাদের আত্মীয়ের নিখোঁজের ভার চেপে বসেছে তার মনে।
শোক শঙ্কা আর মৃত্যুর গন্ধ মিশে রয়েছে রাঙ্গামাটির বাতাসে। মানুষের মুখে আতঙ্ক মনে কষ্ট। সবার মনে পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়া মানুষের আহাজারি মিশে রয়েছে।
এই দুঃসহ শোক কাটিয়ে জীবনের প্রয়োজনে বাইরে বেরুচ্ছে রাঙ্গামাটির মানুষ। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবন চালানো দায় হয়ে পড়েছে। ২২ টাকা কেজির আলু বুধবার বিকালে বিক্রি হয়েছে ৪৪ টাকায়, পরদিন বৃহস্পতিবার তা কিনতে হয়েছে ৫০ টাকায়।
পাহাড় ধসের ঘটনায় রাঙ্গামাটির সাথে চারটি সড়ক পথে গত চারদিন ধরে সব ধরনের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় খাদ্য ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকট তীব্র। বিদ্যুতের অভাবে ই-ব্যাংকিং অচল হয়ে পড়েছে। ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পেরে ফিরে আসছেন শত শত গ্রাহক। তাদের জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের চেষ্টা থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কোনো দেখা নেই। রাঙ্গামাটি শহর ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এক ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে রাঙ্গামাটি।
রাঙ্গামাটিতে আটকে পড়েছেন দেশীয় পর্যটকরা। এই বিরূপ পরিস্থিতিতে সেখান থেকে ফিরতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বিদ্যুত্ ব্যবস্থা না থাকায় হোটেলগুলোতে রাতযাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ভূমিধ্বসে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই ৪৪ কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যাত্রী ও পণ্যবাহী ভারী যানবাহন কাপ্তাই এলাকায় চলাচল নিষিদ্ধ থাকায় পণ্যের সরবরাহে কাপ্তাইয়ের উপর ভরসা করা যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়ক বন্ধ থাকায় রাণীরহাট থেকে কাঁচা ও শুকনো খাবার আসা যেমনি বন্ধ রয়েছে, তেমনি জ্বালানিবাহী ট্যাংকলরিগুলোও রাঙ্গামাটিতে ঢুকতে পারছে না। পাশাপাশি রাঙ্গামাটি-মানিকছড়ি-খাগড়াছড়ি (আরএমকে) সড়ক, ঘাগড়া হয়ে কাপ্তাই সড়ক এবং রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়ক ভূমিধ্বসজনিত কারণে গত সোমবার থেকে বন্ধ থাকায় শাকসবজি, তরিতরকারির মতো কাঁচাপণ্যের সরবরাহও রাঙ্গামাটিতে আসতে পারছে না। এসবের দামও গত বুধবার থেকে হু-হু করে বাড়তে শুরু করেছে। সেই সাথে চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে রাঙ্গামাটিতে।
বর্তমানে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাঙ্গামাটি থেকে কাপ্তাই নৌপথে লঞ্চ ও ইঞ্জিনবোট একমাত্র ভরসা। যোগাযোগের অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে লঞ্চ ও ইঞ্জিনবোট পরিচালনাকারীরা যাত্রী পিছু ভাড়ার অঙ্ক দ্বিগুণ-তিনগুণ করে দিয়েছে। আগে যেখানে একজন যাত্রীকে নৌপথে রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই যাতায়াতে দিতে হতো ৫০ টাকা, সেখানে বর্তমানে দিতে হচ্ছে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। নৌপথে চট্টগ্রামে খাদ্য, জ্বালানি সহ নিত্যপণ্য চাহিদা অনুযায়ী আনা সম্ভব হচ্ছে না।
গতকাল চট্টগ্রামের পিডিবি’র ভারপ্রাপ্ত চিফ ইঞ্জিনিয়ার মৃণাল সেন ইত্তেফাককে বলেন, রাঙ্গামাটিতে বিদ্যুৎ কবে দেওয়া যাবে তা বলা যাচ্ছে না। কারণ বিধ্বস্ত রাস্তাঘাটগুলো কোনোভাবেই চলাচলের উপযোগী নয়। লাইন ও ট্রান্সফরমার মেরামতে ঘটনাস্থলে যাওয়ার কোনো উপায়ই নেই। অবস্থা খুবই শোচনীয়। তিনি জানান, রাঙ্গামাটিতে চন্দ্রঘোনা গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এখানে বিকল্প কীভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে তার কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় রাঙ্গামাটি শহরের সকল ইন্টারনেটভিত্তিক কম্পিউটার সিস্টেম অচল হয়ে পড়েছে। সরকারি বেসরকারি অফিস, কারখানা, বাসাবাড়িতে জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের অভাবে পাম্প চালানো যাচ্ছে না বলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে শুরু করেছে। পর্যটন মোটেলসহ শহরের কোনো আবাসিক হোটেলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। হোটেলগুলো নিদারুণভাবে ফাঁকা হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের অভাবে চার্জ দিতে না পারায় শহরের শত শত স্মার্ট ও মোবাইল ফোন অচল হয়ে পড়ছে। অনেকে জেনারেটর চালিয়ে ফোন সচল রাখার চেষ্টা করলেও মোবাইল ফোন অপারেটরের নেটওয়ার্ক কভারেজে নজিরবিহীন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো অপারেটরের সেলফোনে এমন দশা যে, বুধবার সারা রাত দেখা গেছে শর্ট মেসেজ পাঠানো যাচ্ছে কিন্তু কথা বলা যাচ্ছে না।
রাঙ্গামাটি শহরের একমাত্র গণপরিবহন তরল জ্বালানিচালিত অটোরিকশার চলাচল অকটেনের অভাবে গতকাল থেকে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। স্বল্প সংখ্যক যে কটি অটোরিকশা বৃহস্পতিবার চলাচল করেছে সেগুলো যাত্রীপিছু নির্ধারিত ভাড়া ১০ টাকার স্থলে ১৫ টাকা করে আদায় করেছে। রাঙ্গামাটির খুচরা বাজারে গতকাল অকটেন বিক্রি হয়েছে প্রতি লিটার ৯০ টাকার স্থলে ১২০ টাকায়। বাজার থেকে কেরোসিন উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন জনসাধারণ। সরবরাহ না থাকায় মোমবাতিও পাওয়া যাচ্ছে না।
রাঙ্গামাটির বিভিন্ন পর্যায়ের পর্যবেক্ষক ও ব্যক্তিরা ইত্তেফাককে বলেন, এই পার্বত্য এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর মানবিক বিপর্যয় এড়াতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সেজন্য তারা বিধ্বস্ত চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের মঘাইছড়ি থেকে মানিকছড়ি পর্যন্ত সড়ক পুনরুদ্ধার, মেরামত, সংস্কার ও যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে পঞ্চাশটি ড্রেজার, পঞ্চাশটি ক্যাটারপ্ল্যাটারসহ আধুনিক সড়ক নির্মাণ সামগ্রীসমৃদ্ধ ৫০টি টিমকে অবিলম্বে কাজে নামানোর জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। এদিকে গতকাল রাতে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়।
মেঘ দেখলেই ভয়
রাঙ্গামাটির মানুষ এখন আকাশে মেঘ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। পাহাড় ও ভূমিধ্বসের ব্যাপক ধ্বংসলীলার স্বাক্ষর সর্বত্রই প্রকট। বুধবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর জোন সদরদফতরে প্রশাসন ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সভা হয়। বুধবার দিবাগত মধ্য রাতে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের নির্দেশে রাঙ্গামাটির সর্বত্র ব্যাপক মাইকিংয়ের মাধ্যমে বলা হয়, আবহাওয়া অধিদফতর রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি করেছে এখানে আবারো ভারী বর্ষণ হতে পারে। তাই ভূমিধ্বসের আশঙ্কা রয়েছে। জনগণকে তাই পাহাড় সংলগ্ন বাসাবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে অবিলম্বে চলে যেতে বলা হয়। বুধবার সারারাত রাঙ্গামাটিতে গুমট গরম ও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বৃহস্পতিবার আবারো ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সুত্র : ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button