sliderবিবিধশিরোনাম

স্মরনঃ ফররুখ আহমদ: নির্বাসিত যুবরাজ

মীর সালমান শামিল : বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ যার এত বিপুল জনগষ্ঠী কিন্তু নিজস্ব সাংস্কৃতিক বায়ান নেই। বাংলাদেশের কালচারাল এলিটরা সংস্কৃতির নামে যা করে তা মূলত পশ্চিম বাংলাকে নকল, হুবহু।

ঠিক এইভাবে তারা মঙ্গলযাত্রা করে কারন তারা জানে ওপার বাংলায় কোলকাতার বাবুরাও ঠিক এমন কিছু করতেছে। নাটক বা মঞ্চ নাটকে যান, স্টেজের সাজসজ্জা ঠিক কোলকাতার কপি। ও পারে হচ্ছে মীরাক্কেল তা দেখে তারা বানাচ্ছে হা-সো। এরা বাংলাদেশ আইডল করছে কারন পাশের দেশে ইন্ডিয়ান আইডল হচ্ছে। কোন মননশীলতা নেই, কোন দর্শন নেই, কোন চিন্তাভাবনা নেই। আছে শুধু নকল, পরের ভঙ্গি নকল করে নটের মত কেন চলিস?

গত ৫০ বছরে দেশের সবচেয়ে বড় চলচিত্রকার হলেন তারেক মাসুদ। তারেক মাসুদ আর মৌসুমী ভৌমিকের একটা কথোপকথন দেখেছিলাম, যশোর রোড গানটা কিভাবে হল তা নিয়ে। তারেক মাসুদের কথা শুনলে মনে হবে না আপনার যে পূর্ব বাংলার কেউ কথা বলছে, একেবারে কোলকাতার বাবুদের মত ভঙ্গিমা, সর্বনাম পদ এবং ক্রিয়াপদের ব্যবহার, একই রকম শব্দ চয়ন। শিল্প বা সিনেমা হল সমাজের প্রতিচ্ছবি।

গত ৫২ বছরে একটা সিনেমা দেখাতে পারবেন না যেখানে প্রোটাগোনিস্ট একজন ধার্মিক। একটা সিনেমা পাবেন না যেখানে মসজিদ, তারাবি, শবে বরাত, শবে কদর বা রমজান মাস আছে। কারন ঐ যে, পরিচালক কোলকাতার বাবুদের সিনেমাতে যে এসব দেখে নাই!

এভাবে তো সংস্কৃতি হয় না। এসব করে আপনি বড়জোর একটা হারবোলা হতে পারবেন। ব্যাপারটা একদিনে হয়নি। অল্প কথায় বললে পুথি সাহিত্য, আলাওল, ফকির গরিবুল্লাহ, দৌলত কাজীদের মৌলিক কাজ, কিংবা ভাটিয়ালি, জারি, মুরশিদি, ভাওয়াইয়া গান সবমিলিয়ে পূর্ব বাংলার একটা নিজস্ব সাংস্কৃতিক বলয় ছিল।

অস্টদশ শতাব্দীর কলোনিয়াল/হিন্দু রেনেসাঁসের পরে ইংরেজি সাহিত্যের আদলে কোলকাতায় একটা সংস্কৃতিক ঘরনা তৈরি হয়। ধীরে পূর্ব বাংলাে একাংশ এই সংস্কৃতি ধারা দিয়ে প্রভাবিত হয়ে যায়। কালচারাল এলিটেরা যে সমাজ, মনন দেখানোর চেষ্টা করে তাদের সিনেমা, গান বা নাটকে সেটা ঢাকা, রাজশাহী বা মুন্সিগঞ্জ না। সেটা তাদের কল্পনার কোলকাতা।

আমাদের সমাজের মনন, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির স্বরুপ কেমন হবে এটা নিয়ে ড. আহমদ শরীফ বলেছিলেন,

❝ আমাদের বাংলা ভাষার স্বকীয় আদর্শে সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে, আদর্শ হবে কোরআনের শিক্ষা, আধার হবে মুসলমানি ঐতিহ্যানুগ আর বিষয়বস্তু হবে ব্যক্তি বা সমাজ না বৃহদার্থে জগৎ ও জীবন। এভাবে আমাদের জাতীয় জীবন ও জাতীয় সাহিত্য গড়ে উঠবে। সাম্প্রতিক সাহিত্যে তরুণ কবি ফররুখ আহমদ একান্তভাবে মুসলিম পরিপ্রেক্ষিতে কাব্য সাধনা করে পথের দিশারীর গৌরব অর্জন করেছে ❞

ফররুখ আহমদ ইসলাম এবং পাকিস্তান দর্শনে বিশ্বাস করতেন। তিনি ভারতের আর্থিক, গোয়েন্দা, কূটনৈতিক, এবং সামরিক সাহায্য নিয়ে করা যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন।

কিন্তু তিনি তদানীন্তন শাসকের সবচেয়ে কঠোর একজন সমালোচক ছিলেন। তাদের ব্যঙ্গ করে ‘রাজ-রাজড়া নামে একটা নাটক লিখেছিলেন। তিনি সরকারের সমর্থক রাইটার্স গিল্ডের কোন অনুষ্ঠানে পশ্চিম পাকিস্তানে যাননি কোনদিন। ১৯৫৮ সালে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রুপাত্মক কবিতা লিখে রোষানলে পরেন। এজন্য তিন বছর উনার বই প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিল।

পরে সরকার ফররুখ আহমদকে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অব পারফরমেন্স প্রদান করে তবে তা আইয়ুব খানের কাছ থেকে গ্রহন করতে তিনি অস্বীকার করেন।

বাংলা একাডেমির সাবেক প্রধান রফিকুল ইসলাম বলেছিলো সরকার সব সময় চেস্টা করতো ফররুখ আহমদকে কাছে টানার কিন্তু তাকে কোনদিন এক চুলও নাড়ানো যায়নি। ফররুখ আহমদ রেডিও পাকিস্তানে চাকুরি করতেন কিন্তু কোন আমলাকে তোয়াক্কা করেন নাই; বরং এসব জাদরেল আমলারাই ঢাকা এলে ফারুক আহমেদের ভাঙা বাড়ীতে গিয়ে উনাকে তােয়াজ করে আসতেন।

একবার সরকার ফররুখ আহমদকে হজ্জ্বে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়, তিনি জবাবে বলেন,

❝ আমি ড্রেনের পানি দিয়ে ওজু করি না ❞

সুফিয়া কামাল, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান প্রমুখেরা যুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলে সুবিধা নেন৷ আবার যুদ্ধের পরে রীতিমত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক বনে যায় এবং সরকারের বিভিন্ন সুবিধা পায়।

কিন্তু ফররুখ আহমদ তার আদর্শ থেকে চুল পরিমান বিচ্যুত হননি। ফলাফল, শেখ মুজিব সরকার উনার চাকুরি কেড়ে নেয়, উনার জামাই এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সৎভাবে পরিশ্রম করে বাঁচার রাস্তা একেবারে বন্ধ করে দেয়। রাস্তাঘাটে কবির বেরােবার পথ বন্ধ করে দেয়। তার এক ছেলে ডাক্তারি পড়ছিল, টাকার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। চিকিৎসার অভাবে এক মেয়ে মারা যায়। তখন রমজান মাস ছিল। টাকার অভাবে ও শারীরিক অসুস্থতার কারনে না খেয়েই রোজা রাখতেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সরকারের এই অত্যাচারে ১৯৭৪ সালের ২৭শে রমজান [১৯ অক্টোবর] ইন্তেকাল করেন কবি।

মৃত্যুর চার বছর পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ফররুখ আহমদকে ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা পদক প্রাদান করেন। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কিছুটা হলেও জাতির পাপ মোচন করেন।

একাধারে বলিষ্ঠ এবং কোমল চরিত্রের অধিকারী ফররুখ আহমদ উপমহাদেশের দুইজন মহান কবির উত্তরাধিকার। প্রথমে অবধারিতভাবেই নজরুল। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের পরে ফররুখ আহমদই প্রধান বাঙালি মুসলমান কবি। নজরুল ফোট উইলিয়াম কলেজ পূর্ববর্তী আরবি-ফারসি শব্দ সমৃদ্ধ বাংলা ব্যবহারের নব সূচনা করেন। ফররুখ সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

আর চেতনায় ফররুখ আল্লামা ইকবালের পরবর্তী ধাপ। ইকবাল স্বপ্ন দেখেছিলেন উপমহাদেশে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের আর ফররুখের আহবান করে গেছেন এই জরাগ্রস্ত মুসলমানদের ঘুরে দাঁড়াতে। তবে তিনি শুধু রেনেসাঁসের স্বপ্নই দেখিয়ে যাননি, ইকবালের মতই ফররুখও ছিলেন একজন পরিপূর্ণ কবি।

ফররুখ মুসলমানদের জাগরণ এবং জীবনবোধ দুটোকেই গভীরভাবে ধারন করে লিখেছেন, উপস্থাপন করেছেন বাংলাদেশের সাহিত্যের একটা স্বতন্ত্র রূপরেখা। বাংলাদেশে এর আবেদন হাজার বছরেও শেষ হবে না।

এখন আমাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্র ডমিনেট করে কালচারাল এলিট নামের হারবোলা এবং নটেরা। তাই ফররুখ আহমেদ অনেকটা নির্বাসিত। তবে মৃত্যু সাতশো বছর পরে যেমন সমগ্র পৃথিবী জালাল উদ্দিন রুমিকে খুঁজে ফেরে, আমেরিকার পঞ্চাশটার বেশি রুমি ক্লাব তৈরি হয়, ইন্টারনেটে শত শত কাব্য প্রেমিক রুমির মসনবী পাঠ করার জন্য ‘Chat Club -এ এসে প্রতি সকাল সন্ধ্যায় মিলিত হন, সেভাবে একদিন নির্বাসিত যুবরাজও ফিরবেন, অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে অযুতগুন প্রাসঙ্গিক হয়ে, চারদিক আলোকিত করবেন তার অমিয় শক্তি দিয়ে যেভাবে পূর্ণিমার চাঁদ আলোকিত করে আমাদের এই পৃথিবীকে, আমবস্যার পরে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button