sliderমতামতস্থানিয়

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে সচেতনতার সাথেকঠোর আইনের বাস্তবায়ন প্রয়োজন

মোহা: সফিকুল ইসলাম: আমাদের সমাজে মাত্রারিক্ত নারী ও শিশু নির্যাতন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ সহ বিভিন্ন পর্যাযে এটি মানবিকতা, নৈতিকতা, সামাজিক চরম অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি?

এখান থেকে বেরিযে এসে কল্যাণ মূলক সমাজ গঠনে সকলকে সচেতন হওয়া অপরিহার্য হযে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলি চোখে পড়ার মত। শিশুদেরকে শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, অপহরণ, ও হত্যা প্রভৃতি ঘটনা নিরাপত্তাহীনতার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের নিত্য সংগী।

বাংলাদেশের এখন নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সবক্ষেত্রেই এ ধরনের অপরাধ অহরহ ঘটছে। অপরাধীরা উপযুক্ত বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক কুসংস্কার এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দুর্বলদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। আমাদের সমাজে নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে আর্থ-সামাজিক অবস্থানগত কারণে দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা প্রায়ই তাদের সহজ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা কেবল ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের নৈতিকতা, শান্তি-শৃঙ্খলা, কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করেবর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা ও প্রবণত।বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি ২০২৬ সালেও অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন দেশে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, সম্মুখসারিতে কাজ করা মানবসেবা ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর তীব্র অর্থসংকট এবং লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কয়েক দশকের আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় প্রতি তিনজন নারীর একজন তার জীবদ্দশায় ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত হয়রানি ও হুমকির মাধ্যমে নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক আন্দোলনকারী ও পরিচিত ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০২৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অপরাধীদের প্রতি ‘শূন্য-সহনশীলতা’ নীতি কার্যকর করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রঃ বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক মাসেই সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে – যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর গত নয় মাসের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে ৪৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫ জন শিশু শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা অথবা যৌন নির্যাতনের পর করুণ পরিণতি হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপাত্তসমূহঃ দেশের ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু শৃঙ্খলার নামে শারীরিক সহিংসতার ও ৪৭.২ শতাংশ শিশু কিশোরী ১১-১৫ বছরের মধ্যেই বাল্য বিয়ের শিকার।প্রায় ৭০ শতাংশ নারী স্বামী ও সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। এত কিছুর পরেও সামাজিক কলঙ্ক, প্রতিশোধের ভয়, অর্থনৈতিক নিভরতা এবং সামাজিক চাপে অধিকাংশ ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা নিতে না পারায় সামাজিকভাবে আপস করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশে ১০২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং ‘১০৯ ও ১০৯২১’ জাতীয় হেল্পলাইনের মতো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন অনেকটা কম। তথ্য মতে ২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নথিভুক্ত ৫,৬০০টিরও বেশি যৌন সহিংসতার মামলার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ মামলায় রায় কার্যকর হয়েছে। কৌশলগত পদক্ষেপে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। দেশে একটি ডেডিকেটেড ‘শিশু বিষয়ক বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করা, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সংস্কার করা এবং পেশাদার ও সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কর্মী দল গঠন । বিভিন্ন খাত থেকে সমন্বিত একটি কার্যকরী কর্মগোষ্ঠী গঠন ও সঠিক দায়িত্ব পালন নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারে।
প্রযুক্তির প্রভাবঃ প্রযুক্তি সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে মৌলিকভাবে বদলেদিয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটে যেকোনো নির্যাতন ও সহিংসতার ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অতীতেও এত ছিল না। এর ভাল ও মন্দ দিক আছে। তা ভাল দিক হলো: প্রথমত: অন্যায়ের ভিডিও বা ছবি দ্রুদ জনমত গঠন কওে ও অপরাধীকে দাগী করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে।

মন্দ প্রভাব: সহিংসতার দৃশ্য বারবার দেখায় মানুষের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে।

নারী ও শিশুদের ওপর এ প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হয়। কোনো মা ও শিশুর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা হয়। একইভাবে, প্রকাশ্যে কোনো নারীকে লাঞ্ছিত হতে দেখলে অন্য নারীদের মনে ভয় জন্মায় এবং তারা নিজেদের স্বাধীনতা ও চলাফেরা সংকুচিত করেন। এভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও প্রযুক্তি মারফতে পুরো সমাজে এক যৌথ মানসিক আঘাত ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে।

এছাড়া প্রযুক্তির যত্রতত্র ব্যবহারে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন না রাখা, সংবেদনশীল ছবি বারবার পোস্ট করা কিংবা গুজব ছড়িয়ে দেয়ায় ভুক্তভেগী একাকি মত সামাজিকভাবে হেনস্থা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন।

প্রযুক্তি ব্যবহারে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের অভাবে রাজ নৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্ব্দ্ব নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে অনেকেই মনে করেন।প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে গণপিটুনি, শারীরিক নির্যাতন, প্রকাশ্যে অপমান ও নৃশংসতা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে।একইভাবে, পারিবারিক সহিংসতা একটি মারাত্মক কিন্তু গোপনীয় সমস্যা। স্ত্রীর ওপর নির্যাতন, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা এবং বয়োবৃদ্ধ বা দুর্বলদের অপমান করা গুরুতর অপরাধ হলেও সম্মানহানি ও সংসার টিকিয়ে রাখার চাপে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন।প্রতিকারের উপায় হিসাবে

রাজনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তে সাপেক্ষে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করনের মাধ্যমে সুনিদিষ্ঠ সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা। নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা: পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও লিঙ্গসমতার শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে মেয়েদেরও তাদের অধিকার, আত্মরক্ষা এবং হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ বন্ধ করতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনআনতে হবে। কৌশলে ভুক্তভোগীকে হেনস্ত না করে অপরাধের দায় অপরাধীর।

গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি মেনে অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার বড় বড় অট্টালিকা, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে নয়; বরং তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। নারী ও শিশুর সুরক্ষা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাজ, নাগরিক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা অপরাধকে সমর্থন করার নামান্তর। আজ যে ঘটনা অন্যের পরিবারে ঘটছে, তা আগামীকাল আমাদের নিজেদের ঘরেও ঘটতে পারে। আমাদের এমন এক সমাজ তৈরি করতে হবে যেখানে নারীরা ঘরে ও বাইরে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং শিশুরা ভয়হীন পরিবেশে বড় হবে। কোনো মতপার্থক্যই সহিংসতাকে বৈধ করতে পারে না। নীরবতা ভেঙে সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মাধ্যমেই আমরা একটি বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
লেখক : মোহা: সফিকুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক,বিনোদপুর কলেজ
ও সাংবাদিক,শিবগঞ্জ,চাঁপাইনবাবগঞ্জ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button