
শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা: সোমাবার সকাল থেকে অপেক্ষা। তারপর দুপুর। বিকেল গড়িয়ে প্রায় চারটা। তবু জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা হবে কি না, তা জানতেন না তারা। তপ্ত রোদ এড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে একটি পাকুড় গাছের ছায়ায় বসেছিলেন নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ আর শিশুরা। কারও কোলে শিশু, কারও হাতে পানির বোতল, আবার কেউ সকাল থেকে একমুঠো খাবারও মুখে তোলেননি। তাদের একটাই আশা ছিল প্রশাসকের সঙ্গে একবার দেখা হবে, তিনি হয়তো তাদের কথা শুনবেন, হয়তো উচ্ছেদ কার্যক্রম অন্তত কিছুদিনের জন্য স্থগিত করবেন। কিন্তু বিকেল চারটার দিকে দেখা হলেও সেই আশা পূরণ হয়নি। পরিবারগুলোর দাবি,জেলা প্রশাসক তাদের জানান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সেটিই কার্যকর থাকবে। তারা যেন দ্রুত নিজেদের ঘর সরিয়ে নেন।
এরা সবাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্বরূপনগর গ্রামের সিসিডিবি খাসপাড়ার বাসিন্দা। প্রায় ৫০ পরিবার। স্থানীয়দের দাবি, পাকিস্তান আমল থেকে, না হলেও অন্তত ৭০ থেকে ৮০ বছর ধরে তিন-চার প্রজন্মের মানুষ এই খাস জমিতে বসবাস করে আসছেন। এখন তাদের মধ্যে উচ্ছেদ আতঙ্খ।
গতকাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে কথা হয় লাইলী বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, ছ্যালাপ্যালা বহুবেটি লিয়্যা এত বছর থ্যাকা এখানে আছি, এখন এই জায়গা ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? হ্যামার তো আর কোনো জায়গা নেই।” পাশেই বসেছিলেন রওশন, শান্তি ও আরও কয়েকজন নারী। তাদের কণ্ঠেও একই আতঙ্ক। শান্তি বলেন, “আগে খড়ের ঘর ছিল। তিল তিল করে টিনছাপড়ার ঘর করেছি। এই ঘর ভেঙে দিলে আমাদের সারাজীবনের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাবে।
”জড়ো হওয়া পরিবারগুলো জানান, একটু মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে তাদের বাড়িঘর রেখেও সেখানে রাস্তা সংস্কার করা যেতে পারে। আমরা এতদিন ধরে এখানে আছি। এখানেই কাজ করি, এটা শহরের কাছেই, এখান থেকে চলে গেলে রুটিরুজিতেই আঘাত পড়বে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় জায়গাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ খাস জমি। ভূমিহীন পরিবারগুলো নিজেরাই পরিষ্কার করে সেখানে বসতি গড়ে তোলে। সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে একটি পাড়া। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা পৌরকর দিয়ে আসছেন। পৌরসভার উদ্যোগে ওই এলাকার রাস্তায় হেয়ারিং (কার্পেটিং) করা হয়েছিল। সেই রাস্তা এখনো আছে। এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যমান রাস্তা প্রশস্ত করে ৮ থেকে ১০ ফুট করা এবং রাস্তার নিচ দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করলেও যোগাযোগ ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যার সমাধান সম্ভব। এতে দীর্ঘদিনের বসতিও অক্ষত রাখা যাবে।
তবে সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, খাস জমিতে থাকা বসতির পেছনের ও সামনে কিছু আমবাগান প্লট আকারে বিক্রি হয়েছে। বসতির কারণে ওই প্লটগুলোর মূল্য কমে যাচ্ছে। এ কারণেই তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক কর্মচারী এ বিষয়ে ভুমি মালিকদের সঙ্গে জোগসাজস করে এমনটা করছেন বলে অভিযোগ এখানকার বাসিন্দদের।
উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একরামুল হক নাহিদ বলেন, “সেখানে গিয়ে বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য সময় দিয়েছি। আশা করি তারা সরে যাবে”,
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুশা বলেন, পৌরসভার ভিতরে খাসজমি দখলমুক্ত করা হবে। তবে “যারা প্রকৃতপক্ষে ভুমিহীন, তাদের পুনর্বাসন করা হবে।”
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ হারুন বলেন, “পাকিস্তান আমল থেকেই সেখানে মানুষের বসতি ছিল। তবে এ উচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমি কিছু জানি না,বর্তমানে ঢাকায় আছি। খোঁজখবর নিচ্ছি। আপাতত উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। ঢাকা থেকে ফিরে ওই এলাকা পরিদর্শন করব।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল জানান, তারা ওখানে বহু বছর ধরে আছে, তাদের উচ্ছেদ করার আগে পূণবাসন করতে হবে। আমি কালই সেখানে যাব।




