
স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোর: “বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছি নারী, অর্ধেক তার নর।”-সৃষ্টির শুরু থেকে অদ্যাবধি নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। সৃষ্টি ছাড়া এ জগৎ অকল্পনীয়। সৃষ্টিকে যদি জানতে বা মানতে হয় তাহলে নারী শক্তিকে জানতে হবে।সকল সৃষ্টির আধার হচ্ছে নারী। আমরা যদি আদিম যুগেও ফিরে যাই তাহলে দেখব জীবন -জীবিকা ও বেঁচে থাকার তাগিদে যে কৃষিকাজের সূচনা হয়েছিল তারও আদ্যশক্তি ছিল এই নারী। নারীশক্তি ছাড়া এ জগৎ সত্যি অকল্পনীয়। নারী প্রতিটি মানুষের প্রেরণারও উৎস। সকাল থেকে ঘুমানোর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের হাজারো কাজের মধ্যে সন্তানসহ পরিবারের প্রতিটি সদস্যেকে পরম মমতায় আগলে রাখে। অথচ সেই নারীর পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ও কর্মক্ষেত্রে তার কাজের অবদানকে প্রতিষ্ঠিত করতে একটি নির্দিষ্ট দিবসকে উপলক্ষ্য করে পালন করতে হয় যা সত্যিই কষ্টের ও বেদনার।
তেমনিই একটি কষ্ট ও বেদনাদায়ক দিন মার্চ মাসের ০৮ তারিখ। সারা বিশ্বব্যাপি নারীপুরুষ নির্বিশেষে একটি প্রধান উপলক্ষ্য হিসাবে এই দিবসটি পালন করে থাকেন যা আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে খ্যাত।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারীদিবস পালনের প্রধান লক্ষ্য বিভিন্ন। কোথাও নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা দিবসটি পালনের মূখ্য বিষয় আবার কোথাওবা মহিলাদের অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার বিষয় গুলি গুরুত্ব পায়।
এই দিবসটি উদযাপনের পিছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। আর সেই মিছিলে চলে সরকারি লাঠিয়াল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যালডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন এবং ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দেয়। এ সম্মেলনে জার্মান রাজনীতিবিদ ও জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির ক্লারা প্রতি বছর ০৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসাবে দিনটি পালিত হবে। ১৯১৪ সাল থেকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ০৮ মার্চ পালিত হতে লাগলো।
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পূর্ব থেকেই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ সালের ০৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।দিবসটি পালনের জন্য জাতিসংঘ বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে নারীর সমাধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভিপ্রায় নিয়ে।
প্রতি বছরই পৃথক পৃথক মূল বিষয় নিয়ে দিবসটি পালিত হয়। শুধুমাত্র ১৯৯৬ সালে নির্দিষ্ট থিম নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসটি পালিত হয়েছিল।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো:”নারীর সমতা, আগামীর নিশ্চয়তা”-এই প্রতিপাদ্যটি মূলত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। প্রতি বছর ৮ মার্চ সারা বিশ্বে নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অর্জনকে উদযাপন করতে এই দিবসটি পালন করা হয়।
দিবসটির মূল লক্ষ্যসমূহ:
* নেতৃত্বে নারী: নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।
* অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: কর্মক্ষেত্রে বেতন বৈষম্য দূর করা এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নারীকে সহায়তা করা।
* সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ: ডিজিটাল এবং বাস্তব জীবনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
* প্রযুক্তিতে সমতা: তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নারীদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে আনা।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মধ্য দিয়ে নারীত্বের অধিকারের বিষয় তুলে ধরা হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে মহিলাদের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি জানানোর জন্য দিবসটি পালিত হয়। এই দিনে প্রত্যেক নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতার বিষয়ে সচেতন করে তোলা হয়। পাশাপাশি মহিলাদের লড়াইয়ের গতি সঞ্চার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করাও দিবসটি পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য।



