
রতন রায়হান, রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচনী তফসিল আবারও পরিবর্তন করেছে নির্বাচন কমিশন। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে কমিশন নতুন সময়সূচি ঘোষণা করেছে।
বুধবার (৩ ডিসেম্বর) রাত ৯টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. শাহজামান এবং অন্যান্য কমিশনারদের যৌথ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এর আগে ভোটার তালিকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং তালিকায় ‘গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি’ শনাক্ত হওয়ায় ১ ডিসেম্বর ঘোষিত তফসিল সাময়িক স্থগিত করেছিল নির্বাচন কমিশন।
নতুন তফসিল অনুযায়ী, ৪ ও ৭ ডিসেম্বর। প্রাথমিক তালিকা নিয়ে প্রার্থীদের আপত্তি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি। ৭ ডিসেম্বর (২–৪টা) মনোনয়নপত্র বিতরণ ৮–৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বিতরণ ও দাখিল (ডোপ টেস্টের রিপোর্টসহ)। ১০ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ। ১১ ডিসেম্বর প্রাথমিক তালিকা নিয়ে আপত্তি ও নিষ্পত্তি। ২৪ ডিসেম্বর সকাল ৯টা–বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ, শেষে গণনা ও ফলাফল প্রকাশ।
নির্বাচনের এই নতুন সময়সূচি শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করলেও, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকা নিয়ে আগের অসঙ্গতি। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, তালিকায় অনেক শিক্ষার্থীর নাম নেই। একই শিক্ষার্থীর একাধিক রোল নম্বর পাওয়া গেছে। কিছু অপ্রচলিত বা নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থীর নামও তালিকায় পাওয়া গেছে। বেশ কিছু রিসেন্ট গ্র্যাজুয়েট কে ভুলভাবে তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন তদন্তে নামে। তদন্ত শেষে তালিকার অসঙ্গতি স্বীকার করে ১ ডিসেম্বর তফসিল স্থগিত করা হয়।
যৌথ বিবৃতিতে কমিশন দৃঢ়ভাবে জানায়,“নির্বাচন স্থগিত বা তফসিল সংশোধরণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি, দল, সংগঠন বা পক্ষের চাপ কিংবা প্রভাব ছিল এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।” কমিশন আরও জানায়, ব্রাকসু নির্বাচন কমিশন স্বশাসিত ও স্বাধীন নীতিমালা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মেনেই সব সিদ্ধান্ত সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই লক্ষ্য। কোনোরূপ চাপ বা বাহ্যিক প্রভাব গ্রহণ করা হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয় ভুল ভোটার তালিকা নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করলে ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী সঠিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সময় প্রয়োজন ছিল। ভুল দূর না করে নির্বাচন করলে “অন্যায্যতার অভিযোগ” উঠতে পারত। ভোটার তালিকা সঠিক করা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সকল অসঙ্গতি সংশোধন ও তালিকা পুনর্গঠন শেষে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান কমিশনাররা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যারা নির্বাচন চান অনেকেই বলছেন,অবশেষে নির্বাচন হতে যাচ্ছে এটাই ইতিবাচক। ভুল তালিকা ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা ভালো হয়েছে। অন্যদের মতে,বারবার তফসিল পরিবর্তন নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। সময়সূচি পরিবর্তন করে অনিশ্চয়তা বাড়ানো হয়েছে। সঠিক তালিকা এখনো প্রকাশ হয়নি বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা নিশ্চিত?
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাকসু নির্বাচন দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। শিক্ষার্থীদের অধিকার, হল ব্যবস্থাপনা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব গঠনে ব্রাকসুর ভূমিকা রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, নির্বাচন তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করবে। গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনবে। দীর্ঘদিনের শূন্য নেতৃত্ব পূরণ হবে। কমিশন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে জানায়,গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিহার করে দায়িত্বশীল আচরণ করুন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়,ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ সম্পন্ন হওয়া মাত্রই কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। নির্বাচনের সব সিদ্ধান্ত ‘তথ্যভিত্তিক’ ও ‘প্রক্রিয়াভিত্তিক’। শিক্ষার্থীদের যেন কোনো পক্ষের ভুল তথ্যের প্রভাব না পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে,সঠিক ভোটার তালিকা প্রকাশ। মনোনয়ন ও অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা। হল ও সেন্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিয়ম মেনে প্রচারণা পরিচালনা। এসবই এখন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উচ্ছ্বাস থাকলেও, সব পক্ষের জন্য ন্যায্য পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বদলে যাওয়া তফসিল, ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি ও তা সংশোধনের পর নতুন সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে ব্রাকসু নির্বাচন এখন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। শেষ পর্যন্ত ২৪ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে এমন প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের।




