ঘিওরে ছাত্রীকে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ : মামলা তুলে নিতে পরিবারকে হুমকি

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় স্নাতকোত্তর শ্রেণির (মাস্টার্স) পড়–য়া এক ছাত্রীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পরে মানিকগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ওই ছাত্রী। এরপর থেকে মামলাটি তুলে নিতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাঁকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে মামলা করার প্রায় ২ মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে মামলা তুলে নিতে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে থাকা বখাটেদের অব্যাহত হুমকিতে নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কিত নির্যাতিতার স্বজনরা। ন্যায় বিচার নিয়ে অনিশ্চিয়তায় ও আতংক ভুগছে পরিবারটি।
চরম দারিদ্রতার মধ্যেও লেখাপড়া চালিয়ে আসা ওই শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, জরুরি কথা বলার জন্য তাঁকে নিজ বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায় জেলে পাড়ার শ্যামদাস রাজবংশী। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাঁকে র্ধষণ করে শ্যামদাস। আর তার সহযোগী দুজন মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করে। কাউকে ঘটনা জানালে ইন্টারনেটে এই ভিডিও দৃশ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় শ্যামদাস।
গতকাল আলাপকালে ছাত্রীটি জানান, লজ্জায় বিষয়টি মা-বাবা ছাড়া কাউকে বলতে পারেননি। একর্পযায়ে সে অনুভব করে, মামলা না করলে শ্যামদাসের কোনো শাস্তি হবে না। ঘটনার কয়েক দিন পর সে ঘিওর থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু থানা থেকে আদালতে মামলা করার পরার্মশ দেয়। অবশেষে গত ৪ আগস্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন ওই কলেজ ছাত্রী। তিনি আরো জানান, মামলা করার আগে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য সোহেল চৌধুরী বিচার করে দেওয়ার কথা বলে তাঁকে ডেকে ছিলেন। শ্যামদাসের কাছ থেকে ধারণ করা ভিডিও ক্লিপসহ মোবাইল ফোনটিও রেখে দিয়েছেন। কিন্তু‘ ইউপি সদস্য সোহেল চৌধুরী এখন তা অস্বীকার করছেন।
এব্যাপারে ইউপি সদস্য সোহেল চৌধুরী বলেন, রাস্তাঘাটে শ্যামদাস ওই মেয়েটিকে উত্যক্ত করে, এমন একটি অভিযোগ নিয়ে ওই ছাত্রী তাঁর কাছে এসেছিল। তিনি বিচার করে দিতে দুই পক্ষকে ডেকেছিলেন। কিন্তু ছাত্রী না আসায় বিচার হয়নি। পরে ছাত্রীটি ধর্ষনের অভিযোগে আদালতে মামলা করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। ধর্ষণের কোনো ভিডিও তাঁর কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
গতকাল শুক্রবার শ্যামদাসের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। স্বজনরা জানায়, কাজে বাইরে রয়েছেন। তবে প্রতিবেশীরা জানায়, ঘটনার পর থেকে সে বাড়িতে থাকে না।
ওই ছাত্রীর বাড়িতে গেলে তাঁর মা বলেন, ‘ওই লম্পট আমার ম্যায়ারে ধর্ষণ করল। এরপর থেইক্যা ম্যায়াডা আমার ঘরের বাইরে যাইবার পারে না। পড়ালেহাও করবার চায় না। বিচারের লেইগ্যা মামলা করলাম। অ্যাতো দিনেও আসামি ধরা পারলো না পুলিশ। পুলিশ আমাগো কয় মীমাংসার জন্য। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য মেম্বার আর নেতারা হুমকি দ্যায়। ট্যাকা-পয়সাও দিবার চায়। ট্যাকা দিয়া কি আমার ম্যায়ার ইজ্জত ফিরা পামু। আমরা গরিব মানুষ বইল্যা কি মেয়ের বিচার পামু না।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী জানায়, শ্যামদাস মোটা অংকের টাকা দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার (শ্যামদাসের) নামে এর আগেও একাধিক নারী যৌন হয়রানীর অভিযোগে স্থানীয়ভাবে সালিস হয়েছে। আবার অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানায় নি। এদিকে মামলা দায়ের করার ২ মাসেও কাউকে গ্রেফতার না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ঘিওর থানার উপপরিদর্শক (এস.আই) মজিবর রহমান। তিনি অন্যত্র বদলি হওয়ায় মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান এস.আই তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসামির খোঁজ করা হচ্ছে। তাঁকে গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।




