
হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জ জজকোর্টের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য মো. ছালেক হোসেনের বিরুদ্ধে তার নিজ এলাকার অসহায় ও গরীব মানুষের জমি দখল, একাধিক ব্যক্তিকে বিভিন্ন মামলায় আসামি করে হয়রানির অভিযোগে সনদ বাতিলের দাবিতে জেলা আইনজীবী সমিতি বরাবর একটি গণপিটিশন দেন ভুক্তভোগী পরিবার। অভিযুক্ত আইনজীবী মো. ছালেক হোসেন মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ও উপজেলার বাল্লা ইউনিয়নের কলাপাড়া গ্রামের ছামাদ প্রামাণিকের ছেলে।
প্রায় এক সপ্তাহ আগে ভুক্তভোগী পরিবারসহ ৩৮২ জন এলাকাবাসী স্বাক্ষরিত এই গণপিটিশন আইনজীবী সমিতিতে দেওয়া হয়।
গণপিটেশন সূত্রে জানা যায়, আইনজীবী মো. ছালেক হোসেন আইনজীবী পেশায় আসার পর থেকেই তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এলাকার অসহায় গরিব দুঃখী সাধারণ মানুষের উপর নির্বিঘ্নে অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন জনের নামে বেনামে মামলায় আসামী করে হয়রানি করছেন বলে পিটিশনে উল্লেখ করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের একজন তারই পাশের বাড়ির মৃত ইউসুফ আলী। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এই ইউসুফ আলীর জায়গা জোরপূর্বক দখল করে আইনজীবী ছালেক হোসেন। শুধু তাই নয়, এই ইউসুফ আলীসহ তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে একাধিক মামলায় হয়রানি করেন। তার মামলার শিকার হয়ে অবশেষে ইউসুফ আলী মানুষিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পনের দিন আগে তিনি মারা যান।
ভুক্তভোগী ইউসুফ আলীর মেয়ে সাথী আক্তার জানান, আইনজীবী ছালেক হোসেন সর্বপ্রথম একজন নিরীহ গরিব মানুষের নামে মিথ্যা মামলা করে। তারপর তার জায়গা জমি দখল করে। আমাদের বাড়ির জমিজমা জোর করে দখল করে নিয়েছে। আমার বাবাসহ আমাদের নামে এ পর্যন্ত ২৫টি মামলা করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় অন্যান্য জায়গার মামলায়ও আমার বাবাকে আসামী করেছে। গত এক সপ্তাহ আগে আমাদের প্রতিবেশি এক পরিবারের সাথে জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্বে ওই পরিবারের লোকজনকে মারধর করে। তাদের ঘরবাড়ি ভাংচুর করেছে। আবার তাদের নামে মামলাও করেছে। ওই মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশিসহ ১৪জনকে আসামী করে। ওই মামলায় ছালেক আমাকেও আসামী করেছে। অথচ তার তিন দিন আগে আমার বাবা মারা গেছেন। বাবার শোকে আমি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলাম। আর সে আমাকে আসামি করে। এভাবেই সে নামে বেনামে আসামী করে মানুষদের হয়রানি করে। আমরা মানিকগঞ্জ আইনজীবী সমিতির কাছে একটাই দাবি করছি, তদন্ত সাপেক্ষে এই স্বৈরাচার আইনজীবীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থাসহ সনদ বাতিলের জোর দাবি করছি।
অভিযোগে আইনজীবী ছালেক উকিলের পার্শ্ববর্তী সেকেন আলীর ভিটা জোরপূর্বক দখল করে তার ফুফাতো ভাই সেলিমকে দখল দেয়। এ ঘটনায় বাধা দিলে সেকেন আলীর ছেলে মাজেদ আলীকে বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দেয় এবং তার নামে একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে।
সেকেন আলীর ছেলে মাজেদ আলী জানান, এই আইনজীবী ছালেক আমাদের ভিটেবাড়ি দখল করে তার ফুফাতো ভাইকে দখল দিয়েছে। আমার নামে এ পর্যন্ত একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। শুধু আমি নই, এই অঞ্চলে অনেকেই এই ছালেক উকিলের মিথ্যা মামলার হয়রানির শিকার। আওয়ামী শাসনামলে তার দ্বারা বিএনপি’র নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটার এমন পরিবারই বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে। তাই আমরা চাই ছালেকের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু একটা তদন্ত হোক এবং তাকে যথাযথ আইনের আওতায় আনা হোক।
বাল্লা ইউনিয়নের করোরিয়া গ্রামের মৃত পাগাইলার ছেলে আলালের নামে ৩টা মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। অসহায় রিক্সা চালক আলাল আইনজীবী ছালেক হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে সেই মামলা আপোষ করতে বাধ্য হয় বলে জানা যায়।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে আলাল জানান, প্রায় তিন বছর আগে আইনজীবী ছালেক হোসেনের ভাই ফরহাদ আমার এলাকার এক বয়স্ক নারীর ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল উঠায় দেয়। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় ছালেক উকিল তার দলবল নিয়ে আমাকে হুমকি ধামকি দেয়। পরে মানিকগঞ্জ ও হরিরামপুর থানায় আমার নামে তিনটা মিথ্যা মামলা করে। পরে আমার কাছ থেকে ৩০,০০০ হাজার টাকা নিয়ে সেই সে মামলা আপোষ করে।
বাল্লা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মাচাইন গ্রামের বাসিন্দা রিজু চৌধুরী জানান, আইনজীবী ছালেক হোসেন দীর্ঘদিন যাবত এলাকার অসংখ্য গরিব মানুষের জমিজমা দখলসহ বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছে। আমি নিজেও তার মিথ্যা মামলার হয়রানির শিকার। আমাদের বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিএনপি’র সাধারণ ভোটার এরকম অনেক পরিবারদের বিভিন্নভাবে মামলা হামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। যা এখনও চলমান। তাই আমরা এলাকাবাসী চাই, এর একটা সুস্ঠু সমাধান হোক। যেন আর কোনো অসহায় পরিবারকে এই আইনজীবীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হতে পারে।
বাল্লা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শাজাহান মিয়া জানান, প্রতিবেশিদের সাথে ছালেকের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। আমরা অনেক শালিশ বিচার করেছি। সে কোনো শালিশ বিচার মানে না। বিভিন্ন মানুষকে সে মামলায় মিথ্যা,আসামী করে হয়রানি করে আসছে। বাধ্য হয়ে এলাকার লোকজন তার বিরুদ্ধে ফৃুঁসে উঠেছে। আইনজীবী হওয়ায় তার তো আর মামলা চালাতে টাকা লাগে না। কিন্তু অনেক পরিবার তার মিথ্যা মামলার হয়রানির শিকার।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আইনজীবী মো.ছালেক হোসেন জানান, আমাকে হেয় করতে আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগ করেছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযোগকারীদের কোর্টে চলা বিভিন্ন মামলায় আমি তাদের প্রতিপক্ষের হয়ে মামলা পরিচালনা করি। তাছাড়াও আজ আমিও এলাকায় মানববন্ধন করেছি।
মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোকসেদুর রহমান জানান, ছালেকের একটা অভিযোগ আমি পেয়েছি। তবে কোনো গণপিটিশন আমার কাছে এখনও আসেনি। অফিসে হয়তো আসতে পারে। আমরা খোঁজখবর নিয়ে একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
উল্লেখ্য, গত ২৯ জুলাই আইনজীবী ছালেক হোসেনের প্রতিবেশি শেখ শহিদের পরিবারের জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আইনজীবী ছালেকের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী মানববন্ধনও করে।




