sliderউপমহাদেশশিরোনাম

মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের হামলার প্রভাব পড়তে পারে ভারতে!

মিয়ানমারে সামরিক জান্তার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে সাম্প্রতিক একটি বিদ্রোহী হামলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলেও।

মিয়ানমারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের (থ্রিবিএইচএ) কার্যকলাপের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে ভারত।

নয়াদিল্লির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা বাড়ছে, বিশেষ করে মণিপুর ও মিজোরামে, যেখানে সীমান্ত অতিক্রম করলেই মিয়ানমার।

থ্রিবিএইচএ-এর সদস্য মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), দি টাআং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) এবং দি আরাকান আর্মি (এএ)। ২৭ অক্টোবর মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের শান রাজ্যে হামলা চালায় তারা।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অপারেশন ১০২৭’ নামের ওই হামলায় তারা নিশানা করে ১৩৫টি সামরিক ঘাঁটি।

সাম্প্রতিক সহিংসতা ঘরছাড়া করছে শরণার্থীদের
চীনের সাথে মিয়ানমারের সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এছাড়া হারিয়েছে ভারতের মিজোরাম সীমান্তের কাছে অবস্থিত রিহখাওডর শহরের নিয়ন্ত্রণও। সহিংসতা পৌঁছেছে থাইল্যান্ডের নিকটবর্তী মিয়ানমারের কায়াহ রাজ্যে, ভারতের নিকটবর্তী সাগায়িং ও চিন প্রদেশেও।

হানাহানির ফলে মিয়ানমারের হাজার হাজার মানুষ গত সপ্তাহে মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও। পরে তাদের আরেকটি সীমান্ত পারাপারের স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় ও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি সাংবাদিকদের জানান, ‘আমরা মিয়ানমারে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের কথা আবার মনে করাচ্ছি। চিন প্রদেশে রিহখাওডর এলাকায় সহিংসতার ফলে মিয়ানমারের মানুষ ভারতের দিকে চলে আসছে। সীমান্তের এত কাছে এসব ঘটায় আমরা গভীরভাবে চিন্তিত।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে মিজোরামের জন্য তা সমস্যার হতে পারে, কারণ মিয়ানমারের সাথে ৫১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র নয়।

লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক অভিনাশ পালিওয়ালের মতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একটি দ্বিমুখী নিরাপত্তানীতি গ্রহণ করেছে। মিয়ানমারে ভারতের বৃহত্তর স্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তারজন্য সামরিক জান্তাকে সমর্থন করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সীমান্তে টহলও বাড়াচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ পালিওয়াল বলেন, ‘মণিপুরের পরিস্থিতির সাথে মিয়ানমারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে, নয়াদিল্লিতে আগামীতে নতুন সরকার এলেও যে তাদের নীতি বদলাবে, তা নয়। এই সহিংসতা যদি জান্তা সরকারকে সরাতে সক্ষম হয়, যা এই মুহূর্তে নিশ্চিত নয়, তাহলে ভারতকে বিদ্রোহী নেতৃত্বের সাথে বোঝাপড়ায় যেতে হবে।’

১৫ অক্টোবর ভারতের ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিক্রম মিস্ত্রি মিয়ানমারে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে জাতিগত সঙ্ঘাত নিরসনে শান্তিচুক্তির ওপর জোর দেন তিনি।

ভারত-মিয়ানমার সম্পর্ক কি অবিচল থাকবে?
সমালোচকদের মতে, ২০১৫ সালের দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি চুক্তি (এনসিএ) ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বিফল প্রমাণিত হয়েছে।

মাসে প্রকাশিত জাতিসঙ্ঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়াদিল্লি তবুও মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মোট ৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অস্ত্র ও অন্য কাঁচামাল ভারত সরকার-নিয়ন্ত্রিত সংস্থা ও প্রাইভেট কোম্পানিরা তুলে দিয়েছে জান্তার হাতে।

অরিন্দম বাগচি বলেন, ‘তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে সহযোগিতা রয়েছে। আমাদের সিদ্ধান্ত আমাদের স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল।’

একটি স্বাধীন গবেষণা ফোরাম মান্ত্রায়ার প্রতিষ্ঠাতা শানথি মারিয়েট ডিসুজার মতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মিয়ানমার প্রসঙ্গে নীতি বদল করছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই।

তিনি বলেন, ‘যেভাবে ভারত জান্তার সাথে সম্পর্কিত, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করছে, তাতে বরং উল্টাই প্রমাণিত হচ্ছে। সমান্তরালভাবে যে সরকার রয়েছে, ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট, তারা নয়াদিল্লিকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও জান্তা-ঘেঁষা ভারতীয় নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।’

ডিসুজার মতে, এমন দ্বৈতনীতির মাধ্যমে নয়াদিল্লি আসলে ভাবছে যে বিদ্রোহী কার্যকলাপ আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে যাবে ও জান্তা সরকারই ক্ষমতায় থাকবে।

তার মতে, ‘নয়াদিল্লি অবশ্যই এই সহিংসতার প্রভাব নিয়ে চিন্তিত, বিশেষ করে উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যে। কিন্তু তারা সহিংসতা কমানোয় ভূমিকা রাখার বদলে আশা রাখছে জান্তা সরকারের ওপরেই।’
সূত্র : ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button