sliderউপমহাদেশশিরোনাম

টিকবে না মালয়েশিয়া, কেন এই আশঙ্কা প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের?

মালয়েশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ। তেরটি রাজ্য এবং তিনটি ঐক্যবদ্ধ প্রদেশ নিয়ে গঠিত দেশটি। যার মোট আয়তন ৩,২৯,৮৪৫ বর্গকিলোমিটার। দক্ষিণ চীন সাগর দ্বারা দেশটি দুই ভাগে বিভক্ত, মালয়েশিয়া উপদ্বীপ এবং পূর্ব মালয়েশিয়া। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা ৩ কোটি ৩২ লাখ। ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটেনের কাছে স্বাধীনতা অর্জন করে দেশটি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কৃষি নির্ভর মালয়েশিয়া পরিণত হয় একটি শিল্পসমৃদ্ধ অর্থনীতিতে। প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ছিল স্বাধীনতা-উত্তর মালয়েশিয়ার মূল দর্শন। মালয়েশিয়ার দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে আছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা ও উন্নত উন্নয়ন পরিকল্পনা।
কিন্তু সেই সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশটিও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা না হলে মালয়েশিয়া টিকবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এমনকি মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে কিছুটা ধ্বংস হয়ে গেছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার ইব্রাহিম এসব কথা বলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, মালয়েশিয়াকে পরিবর্তন করতে হবে নতুবা এই দেশটি টিকবে না।

আল জাজিরার ১০১ ইস্ট প্রোগ্রামকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “শাসনের কথা বললে, আমি মনে করি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া এবং তা কার্যকর করা আমার দায়িত্ব। কারণ দেশ কিছুটা ধ্বংস হয়ে গেছে। স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং পরিবর্তনের সংকল্প না থাকলে, আমি বিশ্বাস করি না মালয়েশিয়া টিকে থাকবে।”

এসময় তিনি মালয়েশিয়াকে জাতি-ভিত্তিক রাষ্ট্র থেকে প্রয়োজন-ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে ইতিবাচক কর্ম নীতির বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার ওপর জোর দেন।

বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সী আনোয়ার ইব্রাহিম ২০২২ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সেসময় জাতীয় নির্বাচনের পর দেশটিতে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল এবং মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান আব্দুল্লাহ জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের জন্য কয়েকদিনের আলোচনা শেষে তৎকালীন বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন।

জনপ্রিয় এই নেতা ১৯৯০ এর দশকেই দ্রুত রাজনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডে পরিণত হয়েছিলেন। অনেকেই আশা করেছিলেন যে তিনি হয়তো ভবিষ্যতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের স্থলাভিষিক্ত হবেন।

কিন্তু পরিস্থিতি সেরকম হয়নি। অর্থনৈতিক সংকটকে ঘিরে আনোয়ার ইব্রাহিম ও মাহাথিরের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগে একপর্যায়ে ইব্রাহিমকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। অবশ্য তার সেই সাজা ২০০৪ সালে বাতিল করে দেওয়া হলে আনোয়ার পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

আর এরই ফলে প্রায় ২০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় সংস্কারের জন্য প্রচার-প্রচারণা গতি পায়।

আল জাজিরা বলছে, মালয়েশিয়া একটি বহু-জাতিভিত্তিক দেশ, কিন্তু ইতিবাচক পদক্ষেপ নীতির মাধ্যমে মুসলিম মালয় এবং আদিবাসীদের নিয়ে গঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠরা ১৯৭০ সাল থেকে সুবিধা পেয়ে থাকে। এই জাতীয় নীতিগুলো চাকরি থেকে শিক্ষা এবং বাসস্থানের ক্ষেত্রে এই জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেয়।

মূলত ১৯৬৯ সালের মে মাসে মালয় এবং জাতিগত চীনাদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গার পর সামাজিক প্রকৌশল কর্মসূচির অংশ হিসেবে এটি চালু করা হয়েছিল। এসব নীতি অস্থায়ী হওয়ার কথা থাকলেও তা তখন থেকেই রয়ে গেছে এবং এটিই দেশের সংখ্যালঘু চীনা ও ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

এমনকি এই নীতি অনেককে অন্যত্র ভালো সুযোগের সন্ধানে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্যও করেছে। এছাড়া মালয়েশিয়ায় তুলনামূলকভাবে উচ্চ-আয়ের বৈষম্যের মধ্যে এই নীতি যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছেছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আল জাজিরা বলছে, আনোয়ারের জন্য প্রয়োজন বা চাহিদা-ভিত্তিক নীতি ‘মালয়দের জাতি-ভিত্তিক নীতির চেয়ে বেশি সাহায্য করবে, কারণ জাতি-ভিত্তিক নীতিগুলো কয়েকটি অভিজাত এবং তাদের বন্ধুরা নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে বলে প্রমাণিত হয়েছে’।

কিন্তু আনোয়ার এই ধরনের সংস্কারের মধ্য দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আনোয়ার ইব্রাহিম মূলত বহুজাতিক দল থেকে মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে কার্যত নতুন একটি ভিত্তি তৈরি করছেন। কারণ মালয়েশিয়া ঐতিহ্যগতভাবে মালয় এবং অন্যান্য জাতি-ভিত্তিক দলের শাসিত একটি দেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে মালয়রা জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি এবং আইন অনুসারে তারা মুসলিম।

এছাড়া তার সরকারের ভিত্তিও বেশ ভঙ্গুর। কারণ আনোয়ারের পাকাতান হারাপান (অ্যালায়েন্স অব হোপ) জোট নিজে থেকে সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন পায়নি। ক্ষমতায় তার উত্থান কেবলমাত্র মালয়েশিয়ার সাবেক ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাশনালসহ ছোট দলগুলোর সাথে জোটের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল।

আর ওই জোটের নেতৃত্বে রয়েছে কেবল মালয়দের দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)। বারিসান ন্যাশনাল মালয়েশিয়ার জাতি-ভিত্তিক ইতিবাচক কর্মনীতির স্থপতি এবং নিজেদের কয়েক দশক-দীর্ঘ শাসনামলে এই নীতিগুলোকে তারা স্থায়ী রূপ দিয়েছিল।

এছাড়া দীর্ঘকাল ধরে নিজেকে মালয়দের অধিকারের রক্ষক হিসাবে নিজেকে চিহ্নিত করে এসেছে ইউএমএনও।

আনোয়ার অবশ্য তার জোটের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে উদ্বেগ দূর করেছেন। তিনি বলছেন, “গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তার জোট কিছু মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে: এগুলো হলো- সুশাসন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং সাধারণ পুরুষ ও নারীদের চাহিদা পূরণ করতে পারে এমন অর্থনৈতিক নীতি।”

আনোয়ারের প্রধান প্রতিপক্ষ পেরিকটান ন্যাশনাল (ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স) হচ্ছে রক্ষণশীল মালয়-মুসলিম দলগুলোর একটি জোট। এটি ইতোমধ্যেই আনোয়ারকে ‘বেপরোয়া’ বলে সমালোচনা করেছে। মূলত অমুসলিমদের আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল প্রত্যাহার করার বিষয়ে আনোয়ারের সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মতো বিষয়গুলোর সমালোচনা করতেই এভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বিরোধীরা।

এছাড়া চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ছয়টি প্রাদেশিক নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সেসময় দেশটিতে জাতি এবং ধর্ম নিয়ে বিতর্ক আরও উত্তপ্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিরোধী নেতা হামজাহ ১০১ ইস্টকে বলেছেন, “আল্লাহর ইচ্ছায় আমি মনে করি আসন্ন নির্বাচনে আমরা বড় জয় পাব। জনগণ এখনও আমাদের সাথে আছে এবং তারা বিশ্বাস করে না যে, বর্তমান সরকার (শাসন) পরিচালনা করতে পারে … হয়তো জনগণ আমাদের দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।”

অন্যদিকে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, “তার সরকার খুবই স্থিতিশীল।”

মালয়েশিয়ার বর্তমান এই প্রধানমন্ত্রী বলছেন, “আপনি বিরোধীদের কাছ থেকে আর কী আশা করেন? দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আমার দৃঢ় অবস্থানের কারণে কেউ কেউ খুবই বিচলিত। সবসময় এই গুজব ছড়ানো হচ্ছে, মানুষ পক্ষ পরিবর্তন করছে। এটা আমাকে বিচলিত করে না। তারা যদি আমাকে বিচলিত মনে করে তাহলে আমি মনে করি তারা ভুল বুঝেছে।”

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার দাবি করেছেন, “দেশের রাজনৈতিক অভিজাতদের নিয়ে গঠিত সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু শক্তি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কোটি কোটি টাকা নিয়ে দল বেঁধেছে।”
সূত্র: আল জাজিরা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button