sliderমতামতশিরোনাম

কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন : পরিচ্ছেদ-৩

বিমল বিশ্বাস

কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত :

কমরেড অমল সেন, কমরেড বাচ্চু ঘোষ তাঁরা মিলেই তো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাচ্চু ঘোষ ফিরে যাবেন কেশবপুর থানার পাঁজিয়া অঞ্চলে আর কমরেড অমল সেন আসবেন এগারোখান অঞ্চলে। আগেই বলেছি এগারোখানে এসে কমরেড রসিক ঘোষের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন নিজ জমিদার পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। যা সিদ্ধান্ত সেই অনুযায়ীই কাজ। প্রথমেই এগারোখান অঞ্চলে এসে উজিরপুর গ্রামের শিবু মিত্রকে রিক্রুট করার মাধ্যমে উজিরপুর অঞ্চলের কৃষক সংগঠনের কাজে হাত দিলেন। অন্যদিকে নড়াইলের সরসপুর গ্রামে আপন বোনের বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। লক্ষ্য ছিল ওই গ্রামের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী রাজবংশী (জেলে) সম্প্রদায়কে জাল যার জলা তার এই দাবীর ভিত্তিতে রাজবংশী সম্প্রদায়ের অন্যান্য দাবীসহ মৎস্যজীবীদের সংগঠন গড়ে তোলা ও আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য এই সময়কালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে গোপনেই কাজ করতে হতো। প্রাথমিকভাবে উল্লিখিত এই সব কাজে আত্মনিয়োগ করলেন।

১৯৩৭ সালে ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার এগারোখান থেকে পায়ে হেঁটে কৃষকদের নিয়ে যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। স্মারকলিপিতে খাজনা ট্যাক্স কমানো ও আবয়ব করের শোষণ থেকে কৃষকদের মুক্তির দাবি তুলে ধরা হয়েছিল। সেই সময়ে কৃষক মঙ্গল সমিতির ব্যানারে কৃষকদের সংঘটিত করা হতো। বেজপাড়ায় অ্যাডভোকেট গোপাল বসুর বাড়ির পাশে কৃষক মঙ্গল সমিতির জেলা কার্যালয় ছিল। যেহেতু এই সময় কালে পার্টির কাজকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে পরিচালনা করতে হত সে কারণে উজিরপুর গ্রামেই পার্টির ভিত্তি শক্তিশালী থাকার কারণে ১৯৩৭ সালে যশোর-খুলনা পার্টির ২য় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কী ধরনের গোপনীয়তা ওই সময় পার্টি অনুসরণ করতো সে সম্পর্কে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ওই সম্মেলনে যারা প্রতিনিধি ছিলেন তাদের সকলেরই চোখ বাঁধা ছিল। কণ্ঠস্বরে কমরেড অমল সেন প্রতিনিধিদের দুইজনকে চিনতে পেরেছিলেন। একজন হলেন যশোরের কমরেড সুকুমার মিত্র, অন্যজন খুলনার কমরেড শচীন বসু। ওই সম্মেলনে গঠিত কমিটির সম্পাদক ছিলেন কমরেড সুকুমার মিত্র। তিনি ১৯৪০ সাল পর্যন্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করছি যে ১৯৩৭ সালে যশোর খুলনা পার্টির হাতে মাত্র এক কপি কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো (ইস্তেহার) কেন্দ্রের তরফ থেকে পাঠানো হয়েছিল। খুলনা পার্টি প্রথমেই কমিউনিস্ট ম্যানুফেস্টো (ইস্তেহার) কপি করার কাজটি শেষ করে যশোরে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর ঐ কপিটি পাঠায়। কমরেড অমল সেন রাত জেগে মশারীর মধ্যে কুপির আলোতে তা থেকে হাতে লেখা কপি তৈরি করেন। ওই সময় পার্টির সদস্যদের কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়া এক ধরনের বাধ্যতামূলক ছিল। যারা পড়তে পারতেন না তাদের পড়ানো হতো। ১৯৩০ সালে নড়াইল ও মাগুড়ার কিছু অঞ্চলে কৃষকেরা তেভাগার দাবি নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা সৈয়দ নওশের আলীর সমর্থনেও ওই আন্দোলন এগুতে পারেনি। ওই আন্দোলনে সংগঠিত নেতৃত্ব ও শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী না থাকায় ঐ আন্দোলন সফল হতে পারেনি। কিন্তু ১৯৪০ সালে কমরেড অমল সেন ও কমিউনিস্টরা ইজারা প্রথা, তারপরে হাট তোলা ইত্যাদি দাবীতে খাজনা বন্ধের জন্য গোবরা, আগদিয়া, তুলারামপুর, ধলগ্রাম, মাজপাড়া এবং মাদ্রাসার হাটসহ ব্যাপক অঞ্চলে হাটতোলা বন্ধের আন্দোলনে কৃষকদের সংগঠিত করে বিজয় লাভ করেন। কৃষকদের এই বিজয় ১৯৫২ সালের পরেও বহাল ছিল। কমরেড অমল সেন কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার জন্য বাকড়ি, হাতিয়ারা, গুয়াখোলা, বাকলি, মালিয়াট, দোগাছি, কমলাপুরসহ এগারোখানের এই গ্রামগুলি ও বড়েন্দার, বিড়গ্রাম, উজিরপুর, গোবরা এসব অঞ্চলে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক বিস্তৃত কৃষক সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।

কমরেড নুর জালাল যিনি প্রথম জীবনে কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন পরে কৃষক প্রজা পার্টির সদস্য থাকলেও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাথে মিলে পান চাষীদের দাবির শক্তিশালী আন্দোলন ও তেভাগার দাবীতে চাদপুর, দুর্গাপুর, ডুমুরতলা, নয়নপুর, বাহিরডাঙ্গা, দলদিতপুর এসব গ্রামে শক্তিশালী কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন।

উল্লেখ্য ১৯৪০ সালে কমরেড মুজাফফর আহমেদ (কাকাবাবু) যশোর টাউন হলে এক কর্মী সভা করেছিলেন। যে কর্মীসভায় কৃষক নেতা কৃষ্ণ বিনোদ রায়, বাচ্চু ঘোষ, অমল সেন, নুর জালাল, মোদাচ্ছের মুন্সী, অধির ঘোষসহ অনেকেই ছিলেন। ওই কর্মী সভাতেই তেভাগা নিয়ে আন্দোলন করার ব্যাপারে প্রতম আলোচনা হয়েছিল। ১৯৪৩ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ১ম কংগ্রেসে তেভাগার দাবী নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভারতের কৃষকসভা তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তখন থেকেই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। যশোর নড়াইল তথা বৃহত্তর যশোর জেলায় তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা শুরু হয়। ১৯৪৩ সালে পার্টি কংগ্রেসের আগে যশোর জেলা পার্টির সম্মেলন হয়েছিল। ওই সম্মেলনে যে জেলা কমিটি গঠিত হয়েছিল তাদের মধ্যে কমরেড বাচ্চু ঘোষ, কমরেড অমল সেন, কমরেড অধীর ঘোষ, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড নুর জালাল, কমরেড করুণা কিশোর বিশ্বাস ও মাগুরার একজন। ৭ জনের এই জেলা কমিটি তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করতে যেয়ে ভারত সরকারের পুলিশ বাহিনীকে সঠিক কৌশলে কোথায় কি মোকাবিলা করেছিল এ ব্যাপারেও কিছু উল্লেখ করছি। ১৯৪৬ সালে কমরেড জ্যোতি বসু এসেছিলেন বাকড়ি গ্রামে। কমরেড মোজাফফর আহমেদ এসেছিলেন বড়েন্দার গ্রামে। জেলা কমিটির ৭ জন নেতা ছাড়া অসংখ্য নারী পুরুষ তাদের তেভাগা আন্দোলনের যে গুরুত্বপূর্র্ণ অবদান ও ভূমিকা রেখেছিলেন সেগুলোও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চলবে\১৯

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button