slider

প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেবের জীবন চলছে হাটে বাজারে সুপারি বিক্রি করেই

জ. ই. আকাশ, হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : গ্রামে গ্রামে ঘুরে সুপারি কিনে বাজারে বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা ইউনিয়নের পশ্চিম খেরুপাড়া গ্রামের আবু তালেব। তিনি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের রণাঙ্গনের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধকালীন সময়ে তৎকালিন ঢাকা জেলার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২নম্বর সেক্টরের শিবালয় উপজেলার ডেল্টা কোম্পানির সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৫১ বছরেও সরকারি তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি সত্তোরর্ধ্ব বয়স্ক এই বীর সৈনিক আবু তালেব। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে এসে এই বীরমুক্তিযোদ্ধা জীবন জীবিকার তাগিদে বাজারে বাজারে সুপারি বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন বলে জানা গেছে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সুপারি কিনে তা বাজারে বিক্রি করে কোনোরকমে টেনে হিঁচড়ে চলছে স্বামী স্ত্রী দুইজনের সংসার।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শেখ মানিকের ছেলে আবু তালেব পেশায় ছিলেন একজন কৃষক। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি। যৌবনে অধিকাংশ সময় ফুটবল, লাঠিবারি ও হাডুডু খেলে সময় কাটিয়েছেন। বৈবাহিক জীবনে তিনি তিন কন্যা সন্তানের জনক। উত্তরাধিকার সূত্রে জমিজমা যা পেয়েছিলেন, তা বিক্রি করেই তিন মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছে বড় করেছেন। বর্তমানে ভিটেবাড়ি টুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। দেশকে ভালবেসেই স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্ত দুর্ভাগ্য ৭১’র এই বীর সৈনিক এখনও তার নামটি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেট ভুক্ত করতে পারেননি। ছোট মেয়েকে মাস্টার্স পাশ করালেও ভাল চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারেননি। বর্তমানে তিন মেয়েরই বিয়ে হলেও বড় মেয়ে ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। মেঝ মেয়ে স্বামীর সংসারে থাকলেও ছোট মেয়ে স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে নবীনগর একটি পোশাক তৈরির কারখানায় চাকুরি করে। এখন মেয়েদের আয়ের ওপরেই অনেকটা নির্ভর করে চলতে হয় আবু তালেবকে। বয়সের ভাড়ে ন্যূয়ে পড়া আবু তালেব গ্রামে গ্রামে ঘুরে সুপারি কিনে তা বিক্রি করে কোনো রকমে জীবনযাপন করছেন। নিজের নামটি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করতে চষে বেরিয়েছেন জেলা উপজেলার অনেকের কাছেই। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় এখনও তার নাম উঠে আসেনি।
উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাইবাচাই কমিটির সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি এ উপজেলার ‘ক’ বিভাগে যাচাইবাচাই করে ১৭৫ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ তালিকায় আবু তালেবের ক্রমিক নম্বর ৩০। কিন্তু সম্প্রতি ওই ১৭৫ জনের ভেতর থেকে ১৪জন মুক্তিযোদ্ধা গেজেট ভুক্ত হলেও তাতে ঠাঁই হয়নি আবু তালেবের। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, তদবির ছাড়া গেজেট ভুক্ত হওয়া খুবই কষ্টকর। এছাড়াও গেজেটভুক্ত অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিতর্ক রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
সরেজমিনে আবু তালেবের বাড়িতে গেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে প্রাপ্ত তৎকালিন সময়ের তিনটি সনদপত্র দেখান। এতে দেখা যায়, যুদ্ধকালীন সময়ে তৎকালিন ঢাকা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের ২নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর হায়দার ও বাংলাদেশ স্বস্ত্রবাহিনীর অধিনায়ক মুহাম্মদ আতাউল গনী ওসমানির স্বাক্ষরিত স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র, যুদ্ধকালীন সময়ে তৎকালিন ঢাকা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের ডেপুটি এরিয়া কমান্ডার প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান ও যুদ্ধকালীন সময়ে তৎকালিন ঢাকা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী স্বাক্ষরিত ২টি সনদপত্র। সরকারি সুযোগ সুবিধার মধ্যে শুধুমাত্র বয়স্ক ভাতার কার্ডটিই তার একমাত্র সম্বল।
যুদ্ধকালীন সময়ের কথা জানতে চাইলে একান্তু আলাপকালে প্রবীণ বীর সৈনিক আবু তালেব জানান, “আমি যুদ্ধকালীন সময়ে তৎকালিন ঢাকা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২নম্বর সেক্টরের শিবালয় উপজেলার ডেল্টা কোম্পানীর সদস্য হিসেবে নিয়োজিত ছিলাম।শিবালয় উপজেলার মালুচি, আলোকদিয়া চর, ভাদিয়াখোলাসহ বেশ কয়েকটি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু মৃত্যুর সময় হয়ে গেল এখনও আমি সরকারিভাবে গেজেট ভুক্ত হতে পারলাম না।”
গেজেট ভুক্ত না হওয়ায় জাতীয় দিবসগুলোর অনুষ্ঠানে উপজেলায় গেলেও মূল্যায়ন করা হয় না বরং অনেক অপমানিতও হতে হয় বলে জানান এই বীরমুক্তিযোদ্ধা।
গেজেট ভুক্ত না হওয়ার ব্যাপারে উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক তথ্য ও প্রচার কমান্ডার মো. মানিক মিয়া জানান, “ক বিভাগে ১৭৫ জনের মধ্যে ৩০ নম্বর সিরিলে আবু তালেবের নাম আছে। সে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তার সকল সনদপত্র জমা আছে। ফাইলটি মন্ত্রণালয়ে চলে গেছে। একটু খোজখবর রাখলেই হয়তো হয়ে যাবে।”
যুদ্ধকালীন সময়ের তৎকালিন ঢাকা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২২ থানার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও দোহার, হরিরামপুর এবং শিবালয় থানার মুক্তিবাহিনীদের প্রশিক্ষক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, “আবু তালেবকে আমি ভাল করেই চিনি। সে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তার গেজেট তো অনেক আগেই হওয়ার কথা। যদি না হয়ে থাকে তবে এটা দুঃখজনক।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button