জাতিকে অশ্রুসিক্ত করে বিদায় নিলেন শতবর্ষী ক্যাপ্টেন টম মুর

কোভিডে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধাদের সহায়তার লক্ষ্যে প্রায় ৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড ফান্ডরাইজিংয়ের জন্য হিরো হিসেবে খ্যাত শতবর্ষী ক্যাপ্টেন টম মুর করোনা ভাইরাসে মারা গেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন স্যার টম মুর কোভিডে আক্রান্ত হয়ে রোববার হাসপাতলে ভর্তি হন। আজ সারা জাতিকে অশ্রুসিক্ত করে বিদায় নেন তিনি। বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ তাকে অবিরাম শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
বৃটেনের রানী কুইন এলিজাবেত ব্যক্তিগত ভাবে ১০০ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন স্যার টম মুরকে সম্মান জানিয়েছেন। বাকিংহাম প্যালেসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কুইন ক্যাপ্টেন স্যার টম মুরের পরিবারকে শোকের একটি ব্যক্তিগত বার্তা পাঠাচ্ছেন। গত মাসে উইন্ডসরে ক্যাপ্টেন স্যার টম এবং তার পরিবারের সাথে দেখা হয়ে রানী তার মহিমা আন্তরিক ভাবে উপভোগ করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ক্যাপ্টেন টমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সাথে সাথে ডাউনিং স্ট্রিটের পতাকাগুলি অর্ধনমিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাকে বিশ্বের আশার বাতিঘর হিসাবে প্রশংসা করেন। লন্ডন আই, ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম এবং ব্ল্যাকপুল টাওয়ার তার সম্মানে আলোকিত হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাপ্টেন স্যার টম মুর সত্যিকার অর্থে একজন নায়ক ছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অন্ধকার দিনগুলিতে তিনি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। এদেশের গভীরতম যুদ্ধ-সংকটের মুখে তিনি আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তিনি আমাদের সবাইকে উত্সাহিত করেছেন এবং তিনি মানব চেতনার জয়কে মূর্ত করেছেন।
এনএইচএসের জন্য ৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড সংগ্রহের জন্য তার বাগানে ঘুরে ঘুরে দেশের মানুষের হৃদয় জয় করে গেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই সমর নায়ক। তিনি কেবল একটি জাতীয় অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেননি, বিশ্বজয়ের আশার বাতিঘর হয়েছিলেন। বরিস জনসন বলেন, আমাদের একান্তভাবনা তার মেয়ে হান্না এবং তার পরিবারের সাথে রয়েছে ।
বিকেলে ক্যাপ্টেন টমের কন্যারা এই দু:খজনক সংবাদটি প্রকাশ করে বলেন, তাদের বাবা সন্ধ্যা ৪টার পরে মারা গেছেন। তারা বলছিলেন, অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমরা আমাদের প্রিয় পিতা ক্যাপ্টেন স্যার টম মুরের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করছি। আমরা কৃতজ্ঞ, তার জীবনের শেষ সময়গুলিতে তার সাথে ছিলাম। হান্না, বেঞ্জি এবং জর্জিয়া তার বিছানার পাশে ছিলাম। আমরা শৈশব এবং আমাদের দুর্দান্ত মায়ের কথা স্মরণ করে তার সাথে গল্প করার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছি। আমরা একসাথে হাসি এবং অশ্রু ভাগ করে নিয়েছি।
তারা আরো বলেন, আমাদের বাবার জীবনের শেষ বছরটিতে তিনি পুনরায় উদ্দীপনা পেয়েছিলেন এবং এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন যা তিনি কেবল স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি খুব হৃদয়বান। তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য সেরা বাবা এবং দাদা। তিনি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। আমাদের বাবার জীবনের শেষ দিনগুলি এনএইচএস এবং কেয়ারারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত যত্ন অসাধারণ ছিল। তারা নিখুঁতভাবে পেশাদার, দয়ালু এবং মমতাশীল।
চ্যান্সেলর ঋষি সুনাক জাতির এই গর্বিত সন্তানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বলেন, তিনি একজন নিবেদিত সেনা কর্মকর্তা। একটি বিশাল মানবিক তহবিল প্রতিষ্ঠাতা। সর্বোপরি আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। ফরেন সেক্রেটারি ডমিনিক রাব বলেন, তিনি অত্যন্ত অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। আমাদের তিনি মহৎকর্মে অনুপ্রাণিত করেছেন। বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা স্যার কায়ার স্টারমার বলেন, বৃটেন একজন বীরকে হারিয়েছে।
তার পরিবার জানিয়েছেন, মারা যাওয়ার আগে তাকে ‘শ্বাসকষ্টে সাহায্যের প্রয়োজন’ হওয়ায় হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন। হঠাৎকরে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন। রবিবার শ্বাস কষ্ট বাড়ার সাথে সাথে বেডফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। তিনি নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন বলে করোনা ভাইরাস টিকা নেয়া হয়নি। শতবর্ষী ব্যক্তিত্ব বেডফোর্ড হাসপাতালে পরিবারকে সাথে নিয়ে শেষ মুহূর্তের সময়ে শান্তিপূর্ণভাবে ইহ ত্যাগ করেছেন।
গত ৩০ এপ্রিল তার জন্মদিনের আগে আড়াই কিলোমিটার হেঁটে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সোয়া তিন কোটি পাউন্ড অর্থ সংগ্রহ করে স্যার টম মুর দেশ-বিদেশে ব্যাপক ভাবে প্রেরণা সঞ্চার করেছিলেন। ক্যাপ্টেন টম মুরের এই অনন্য অবদানের জন্য বৃটেনের রানী তাকে ‘নাইট’ উপাধি দান করেছেন।
গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ক্যাপ্টেন স্যার টমকে নাইটহুডের জন্য প্রস্তাব করেন। নাইটহুড পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় স্যার টম বলেছিলেন, আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। এটি রানির কাছ থেকে পাওয়া দারুণ সম্মানজনক। স্যার টম বলেন, কাছে গিয়ে রানির সঙ্গে কথা বলাটাও সৌভাগ্যের বিষয়।
রানির পক্ষ থেকে প্রশংসা করে বলা হয়, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। মানবিক কাজে প্রচুর তহবিল আপনি সংগ্রহ করে দিয়েছেন। এই সম্মান জানাতে উইন্ডসর ক্যাসলে একটি অনন্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। রানি ৫ মিনিট ধরে স্যার টম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্যার টমের মেয়ে হাননা ইনগ্রাম, জামাই কলিন ইনগ্রাম ও নাতি-নাতনিরা উপস্থিত ছিলেন।সূএঃ মানবজমিন



