আন্তর্জাতিক সংবাদ

আমি জানতাম তারা কাকে নিয়ে কথা বলছে

কাজল ঘোষ :আমার বেশ ক’জন রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্কুলে ঝরে পড়ার মতো একটি অ-জনপ্রিয় ইস্যুতে কি ধরনের কৌশল নিচ্ছি তা নিয়ে চিন্তিত ছিল। এখনো পর্যন্ত কেউ আমার এ উদ্যোগ নিয়ে কোনো ধরনের প্রশংসা করেনি। তাদের ধারণা আমার এই চিন্তার মাধ্যমে পিতামাতারা এক ধরনের বন্দিত্বের দিকেই এগুবে যদিও সেটি আমার লক্ষ্য নয়। আমাদের প্রচেষ্টা এবং কার্যক্রম হচ্ছে কীভাবে পিতামাতাকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সন্তানদের সত্যিকারের স্থান স্কুলে পাঠানো। আমরা পিতামাতাকে সহায়তা করছি তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য নয় বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ পদ্ধতি অবলম্বন করে আমরা সফল হয়েছি।
এটি এমন একটি ইস্যু যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। আর এ বিষয়টি তুলে ধরতে আমাকে যদি খারাপ মানুষও হতে হয় তাতেও আপত্তি নেই। এতে রাজনীতির কোনো লাভ নেই। আপনি শুধু এটি করবেন যেন এতে পরিবর্তন আসে।
আমার অফিস শহর এবং ডিস্ট্রিক্ট স্কুলগুলোতে যোগাযোগ করে স্কুলে ঝরে পড়া রোধে উদ্যোগ নেয়ার কাজ শুরু করে। এ উদ্যোগ নেয়ায় ২০০৯ সালের ঘটনা নিয়ে আমি গৌরব বোধ করেছি। সান ফ্রান্সিসকোর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের এই উদ্যোগের কারণে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ২৩ শতাংশ সেখানে কমে গিয়েছিল।
আমার সহকর্মীরা যেমনটি প্রত্যাশা করেছিলেন আমরা গবেষণায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশিকিছু পেয়েছি। প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, কোনো শিক্ষার্থী মূলত ঝরে পড়ে কারণ তাদের পিতামাতা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সত্য হচ্ছে বেশির ভাগ পিতামাতাই চান তার সন্তান প্রকৃতিগতভাবেই ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। তারা ভালো পিতামাতাও হতে চান। তাদের শুধুমাত্র তা হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ নেই।
ভেবে দেখুন একা একজন পিতা বা মাতা সপ্তাহে ছয়দিন দুই শিফটে পালা করে কাজ করে এবং তারা এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে। সে তার কাজের ওপর ভিত্তি করে মজুরি পেয়ে থাকে এবং তাদের কোনো ছুটি বা অসুস্থতাজনিত ছুটি নেই। যদি তিনবছর বয়সী সন্তান জ্বরে ভুগে তবে সে তাকে ডে কেয়ার সেন্টারে ভর্তি করতে পারে না। তার বেবিসিটার নিয়োগের জন্য কোনো টাকা নেই, আবার সে নিজে যদি বাসায় অবস্থান করে বেবিসিটারের কাজ করে তাহলে মাসজুড়ে ডায়াপার ক্রয়ের জন্যও তার কাছে কোনো অর্থ থাকবে না। কারণ তার এগারো বছরের বাচ্চার জন্য জুতো কেনাও কষ্টকর হয়ে যাবে। প্রত্যেক মাসে মাসেই তার পা এক সাইজ করে বড় হয়।
এগুলো সমাধান না করে কোনো পরিবর্তন তাদের কি লাভ বয়ে নিয়ে আসবে। যদি কোনো বাবা-মা তার সন্তানকে একদিনের জন্য স্কুলে যেতে নিষেধ করে কারণ তাকে তার ছোট বোনের দেখাশোনা করতে হবে তাহলে আমরা বলতে পারি না ঐ বাবা-মা তাদের ভালোবাসে না। এটাকে বলতে পারি সেই বাবা-মা পরিস্থিতির স্বীকার। তিনি আসলে সেরা বাবা-মা’ই হতে চান।
আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ঝরে পড়া প্রতিরোধে তাদেরকে সাহায্য করা। আমরা স্কুলে গিয়ে সেইসব অভিভাবকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করি। শুধুমাত্র ঝরে পড়া, নিরক্ষরতা এবং অপরাধের তথ্যই নয় যেসব কারণে এইসব অপরাধ সংঘটিত হয় সে সম্পর্কিত তথ্য পাওয়ার জন্য। সিটি এবং ডিস্ট্রিক্ট স্কুলগুলোতে কীভাবে সহজে শিশুদের ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করা যায়, তাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য।
আমরা একসঙ্গে কাজ শুরু করলাম। প্রথমেই স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলো সেসব বাবা- মাকে চিঠি পাঠালো যাদের সন্তানেরা ঝরে পড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন মূলত শিশুর মা। আমি প্রশ্ন করলাম বাবাদের কি হয়েছে? আমাকে ব্যাখ্যা দেয়া হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুরা তার বাবার সঙ্গে থাকেন না এবং তার বাবারাও তাদের সন্তানের জন্য কোনো খরচ পাঠান না।
আমি জবাব দিলাম তিনি হয়তো তার সন্তানের খরচ বহন করেন না এর মানে এই নয়, তিনি চান না তার সন্তান প্রতিদিন স্কুলে যাক। একটি ক্ষেত্রে দেখা গেল একজন তরুণ পিতা জানতে পারলেন যে, তার মেয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছেন না। এরপর তিনি তার শিডিউল পরিবর্তন করে প্রতিদিন তার মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন। এমনকি সে তার মেয়ের স্কুলে স্বেচ্ছাসেবকের কাজও করছেন। আমি যখন অ্যাটর্নি জেনারেল হলাম আমি চেয়েছিলাম আমার ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্যালিফোর্নিয়ায় এই ঝরে পড়া সংকটের সমাধান করবো। আমি জানতাম, ক্যামেরা শুধুমাত্র আমার দিকেই ফোকাস করে থাকবে। তবে, আমি চেয়েছিলাম স্পট লাইটটা মানুষের স্বার্থে সমস্যার ওপরই পড়ুক। যেভাবেই হোক বেশির ভাগ মানুষ আরেকজনের সন্তানের শিক্ষার থেকে নিজের সন্তানের কথা ভাবতেই বেশি পছন্দ করে। আমি তাদেরকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে, আমরা যদি সকলের শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেই তার প্রভাব সবার ওপর এসেই পড়বে। আমাদের প্রথম প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত একবছরে আমরা প্রায় দশ লাখ শিশুকে স্কুলে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। কিছু স্কুল ছিল যেখানে প্রায় সব শিক্ষার্থীই ঝরে পড়েছে। সেখানেও ৯২ শতাংশ উপস্থিতির হার নিশ্চিত হয়েছিল।
আমি এমন একটি অবস্থান নিয়েছিলাম যা হয়তো অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে আমার করার কথা ছিল না। আমি শিক্ষাবিদদের ডেকে ছিলাম, নীতি নির্ধারকদের ডেকে ছিলাম। আলোচনায় বসেছিলাম এবং এরপর যা যা করার দরকার তাই করেছিলাম। তাদেরকে বুঝিয়ে ছিলাম সংকটটির ভয়াবহতা। আমি যখন কথা বলছিলাম, তখন আমি দেখলাম আমার দুই সহকর্মী দর্শক সারিতে একজনের দিকে আঙুল দেখিয়ে কানাকানি করছিল। আমি তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না, তবে আমি জানতাম তারা কাকে নিয়ে কথা বলছে। আমি এটি জানতাম কারণ, মানুষটি ছিল ডগ। কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে,মানবজমিন,

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button