
২০২০ সাল। অন্য কোনো বছরের মতো নয়। পুরো আলাদা ধরনের একটি বছর বিদায় নিচ্ছে। এই একটি বছরে করোনাভাইরাস বিশ্বকে তোলপাড় করে দিয়েছে। কমপক্ষে ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এই ভাইরাসে। শতকরা ৮০ ভাগ কর্মক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শত শত কোটি মানুষ লকডাউনে কাটিয়েছেন বছরের বেশির ভাগ সময়। এ বছরে প্রিয়জনের মুখ দেখাও বন্ধ ছিল।
থেমে গিয়েছিল জন্মদিন, বিয়ে, কোনো বড় আনন্দ অনুষ্ঠান উদ্যাপন। এক করোনা মহামারি সারাবিশ্বের প্রতিটি মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শুধু মানুষের সামাজিক জীবন নয়, রাষ্ট্রীয় জীবন, রাজনীতি সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারাত্মক অন্যায় করা সত্ত্বেও অনেক দেশের সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারেন নি বিরোধী রাজনীতিকরা। এখানে কিছু বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন: যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী নির্বাচন হয়েছে এ বছর। প্রার্থীরা বড় কোনো র্যালি করতে পারেননি। তারা ব্যস্ত ছিলেন ছোটখাট আয়োজনে সমর্থকদের কাছে পৌঁছাতে। ডেমোক্রেট দল থেকে প্রার্থী জো বাইডেন তো প্রায় শূন্য কক্ষে মনোনয়ন নিয়েছেন। নির্বাচনের আগে হোয়াইট হাউসে বেশকিছু ইভেন্ট আয়োজন করা হয়। তাতে উপস্থিত অনেকে করোনা আক্রান্ত হন। এর মধ্যে নাটকীয়তা দেখা যায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে। তিনি নিজে করোনা আক্রান্তের খবর প্রচার করে হেলিকপ্টারে করে উড়ে যান একটি অভিজাত হাসপাতালে। তারপ নাটকীয়তা ঘটতে থাকে। তিনি চিকিৎসা নেয়া অবস্থায় গাড়িতে বেরিয়ে হাসপাতালের চারদিকে চক্কর দেন নেতাকর্মীদের উদ্দেশে। তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হন ট্রাম্প। এর মাত্র তিন দিন পরেই তিনি হাসপাতাল ছাড়েন। ছুটে যান নির্বাচনী প্রচারণায়। সেই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন অনেক কারণে হেরেছেন তিনি। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হলো করোনা মোকাবিলা। ইমোরি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর অ্যালান আব্রামোবিজ বলেন, এটা স্পষ্ট যে, করোনা মহামারি ট্রাম্পকে উল্লেখযোগ্য ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গাইডলাইন অনুসরণ করতে অনুৎসাহিত করেছেন অন্যদের। যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মহামারিকে সিরিয়াসলি নিতেন এবং কার্যকর ব্যবস্থা চিহ্নিত করতেন তাহলে আমি মনে করি, তিনি সহজেই নির্বাচনে জিতে যেতেন। এ ছাড়া মহামারি অর্থনীতিকে অবনমিত করেছে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও। আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের প্রফেসর লিচম্যান বলেন, মহামারিতে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। তার কারণে তিনি পরাজিত হয়েছেন। তিনি দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন।
হংকং বিক্ষোভ: করোনা মহামারির সুযোগে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হংকংয়ের পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আগের বছর সেখানে গণতন্ত্রপন্থিরা প্রায় এক সপ্তাহ বিক্ষোভ করে। কখনো কখনো পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। তাদের দিকে বুলেট ছুড়ে মারে পুলিশ। বিক্ষোভের নিন্দা ওঠে বেইজিং থেকে। ২০১৯ সালের স্থানীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পায় গণতন্ত্রপন্থিরা। কিন্তু নতুন বছর অর্থাৎ ২০২০তে এসে সেই হংকংয়ের রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা। কোনো আন্দোলন নেই। গণতন্ত্রপন্থি আইন প্রণেতারা পদত্যাগ করেছেন লেজিসলেটিভ থেকে। হংকংয়ে রাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকেই করোনা সংক্রমণের কারণে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামেননি সচেতনতার কারণে। তার ওপর তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তামূলক আইন পাস করে চীন। এর অধীনে হংকংয়ে কাউকে দায়ী সাব্যস্ত হলে তাকে চীনের হাতে তুলে দেয়ার কথা বলা হয়। এ অবস্থায় হংকংয়ের নাগরিকরা আশ্রয় চাইলে তাদের আশ্রয় দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে বৃটেন। নিরাপত্তা আইন করে এবং পার্লামেন্ট নির্বাচন স্থগিত করার মাধ্যমে মূলত হংকংয়ে আন্দোলনকারীদের দমিয়ে ফেলা হয়। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের উত্তেজনা দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ চীনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়ার আহ্বান জানায়।
টাইগ্রে সংকট: ২০২০ সালের আগে ইথিওপিয়ার উত্তরে টাইগ্রের নাম আফ্রিকার বাইরে খুব বেশি মানুষ শুনতে পায়নি। কিন্তু নভেম্বরে ইথিওপিয়া সরকার ও আঞ্চলিক দল ট্রাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে কয়েক শত মানুষ নিহত হয়েছেন। কমপক্ষে ৪০ হাজার মানুষ পালিয়ে প্রতিবেশী সুদানে চলে গিয়েছেন। এই যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। সেখানে কোভিড-১৯ এর কারণে জাতীয় নির্বাচন স্থগিত করে দেয়ার পরে সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। এ বিষয়টি সরকার যেভাবে মোকাবিলা করেছে তা থেকেই সংকটের সূচনা। আদ্দিস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রধান সম্পাদক সেদালে লিমা বলেন, এই যুদ্ধের মৌলিক একটি কারণ হলো নির্বাচন স্থগিত করা। নতুন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের অধীনে ২০১৮ সালে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল ছিল ইথিওপিয়া। তার অধীনে ২০২০ সালের আগস্টে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। এটাই ছিল বেশির ভাগ বিরোধীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রথম সুযোগ। এর আগে তারা এই সুযোগ পায়নি। ফলে নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সবাই ছিলেন উচ্ছ্বসিত। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল তীব্র। কেউ কেউ বলেন, নির্বাচনের পরে সহিংসতা দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় করোনা মহামারির অজুহাতে মার্চে নির্বাচন কমিশন প্রথম ভোট স্থগিত করার প্রস্তাব করে। এ প্রস্তাব বেশির ভাগ বিরোধী গ্রুপ মেনে নেয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। এ সময়ের পরে কি হবে সে বিষয়ে বিরোধীদের সঙ্গে একমতে আসতে ব্যর্থ হয় সরকার। পক্ষান্তরে পক্ষপাতী একটি আইনি পরিষদ সরকারের মেয়াদ এবং নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত দেয়। পার্লামেন্টের এই পরিষদ ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে। এর অর্থ হলো বিরোধীদের সঙ্গে বৈধতার সংকটে পড়ে সরকার। আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী আবি’র সঙ্গে বিরোধ ছিল ট্রাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের। তারা এই ইস্যুতে আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তাদেরকে দমন করতে সরকার অভিযান চালায় সেখানে। ব্যস্ত যুদ্ধ শুরু হয় টাইগ্রে অঞ্চলে।
ইসরাইলে রাজনৈতিক সংকট: এপ্রিলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলতে শুরু করেন যে, করোনা মহামারি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে রক্ষা করেছে। তখন সবেমাত্র পঞ্চমবারের মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নিয়েছেন। বিরোধী বেনি গানটজের সঙ্গে গঠন করেছেন ঐকমত্যের সরকার। কিন্তু পুরো বছরেই দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তিনবার জাতীয় নির্বাচন হয়। কিন্তু কোনো পক্ষই ক্ষমতায় যাওয়ার মতো জোট গড়ার মতো পর্যাপ্ত আসন পায়নি। মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বেনি গানটজকে সরকার গঠনের জন্য প্রথম আহ্বান জানানো হয়। কারণ, তিনি বেশি এমপির সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধীরা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জটিলতার মুখোমুখি হয়। কারণ, তারা বিভিন্ন দলের। এরপরেই করোনা মহামারি হানা দেয়। তখনও ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সংকট নেতানিয়াহু। আকস্মিকভাবে লোকজন মনে করতে থাকেন তারা জরুরি অবস্থার মধ্যে আছেন। করোনা পলিসির দায়িত্ব নিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি ঘোষণা দেন, এই জরুরি অবস্থায় দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার তিনিই একমাত্র ব্যক্তি। ফলে নেতানিয়াহুর রাজনীতির জন্য উত্তম সময়ে করোনাভাইরাস এসেছে। এর ফলে তার সঙ্গে যোগ দিতে গানটজের ওপর চাপ বাড়ে। কিন্তু নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে কখনো আলোচনায় বসনে নারাজ গানটজ এ সময়ে ইউটার্ন নেন। তিনি বলেন, এটা স্বাভাবিক সময় নয়। ফলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি সরকার গঠন করেন। েিদরকে দমন করতে সরকার অভিযান চালায় সেখানে। ব্যস্ত যুদ্ধ শুরু হয় টাইগ্রে অঞ্চলে। প্রস্তাব করে। এ প্রস্তাব বেশির ভাগ বিরোধী গ্রুপ মেনে নেয়।
মানবজমিন




