
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার চিম্বুক-থানচি সড়কে আদিবাসী ম্রো অধ্যুষিত এলাকায় বিনোদন পার্ক স্থাপন প্রকল্প বন্ধের দাবি জানিয়েছেন দেশের ৬২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ৩০২ নং লুলাইং মৌজা ও ৩৫৫ নং সেপ্র মৌজার ভেতরে কাপ্রু পাড়া, দলা পাড়া ও শোং নাম হুং জনপদে বিতর্কিত সিকদার গ্রুপের অঙ্গ সংগঠন আর এন্ড আর হোল্ডিং লিমিটেডের সাথে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘ম্যারিয়ট হোটেলস্ এ্যান্ড রিসোর্ট’ (হোটেল ও বিনোদন পার্ক) নামে একটি সুবিস্তৃত পাঁচতারা স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এবং উপরোক্ত আইনসমূহের মাধ্যমে স্বীকৃত প্রথা, রীতি, রেওয়াজ ও পদ্ধতিকে লংঘন করে ম্রো জাতির স্বাধীন ও পূর্ব সম্মতি ব্যতিরেকে, তাঁদের মতামত বিবেচনায় না নিয়ে, একটি বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জোরপূর্বক এমন বিলাসী স্থাপনা নির্মাণকে সংগত কারণেই ম্রো সম্প্রদায়ের ১০ হাজার নাগরিক তাদের ভিটে-মাটি, আবাসস্থল এবং জুম ফসলি জমির উপর আগ্রাসন হিসেবে দেখছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এমন বাণিজ্যিক আগ্রাসন বান্দরবানের প্রাণ-প্রকৃতি এবং ম্রো জাতিসত্ত্বাসহ অন্যান্য আদিবাসী জাতিসত্ত্বার অস্থিত্ব, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিরাপত্তার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ ম্রোসহ অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী অবিলম্বে এ স্থাপনার নির্মাণ কাজ স্থগিত এবং হোটেল ও বিনোদন পার্কের এ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায়, বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন ম্রো নেতৃবৃন্দ।
ইতিমধ্যে তাদের এই আইনগত দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট কমিশন বিবৃতি দিয়েছে যেখানে সিকদার গ্রুপের মতো একটি বিতর্কিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়ে যথার্থ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস্ কমিশন জনস্বার্থ বিরোধী এ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানানোর পাশাপাশি প্রচলিত আইনের অধীনে পার্বত্য জেলাগুলোতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিরও দাবি জানিয়েছে। ম্রো জাতিসহ সকল মহলের এমন আইনগত দাবি উপেক্ষা করে আর এ্যান্ড আর হোল্ডিং লিমিটেড তাদের প্রস্তাবিত স্থাপনার প্রয়োজনে পাহাড় কাটা শুরু করেছে এবং ম্রো জাতির শ্মশান, পবিত্র পাথর, পবিত্র পর্বত, পবিত্র বৃক্ষ ও পানির উৎসে যাতায়াতে বাধার সৃষ্টি করছে। হোটেল ও বিনোদন পার্কে বহিরাগত পর্যটকদের গমনাগমন ম্রো নারীদের নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ হুমকি হবে।
উপরন্তু‘, হোটেলের প্রয়োজনে বিভিন্ন পাহাড়ে স্থাপনা নির্মাণের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে ইতোমধ্যে সংকুচিত ম্রো জাতির জুম চাষের জমিকে আরো সংকুচিত করবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, আর এ্যান্ড আর হোল্ডিং লিমিটেড এর পক্ষে সিকদার গ্রুপের মুখপাত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হোটেল ও বিনোদন পার্কটি নির্মাণে জেলা পরিষদের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন যা প্রচলিত আইনানুযায়ী বেআইনি হবে। বান্দরবান পার্বত্য জেলার বাসিন্দাদের অধিকার ও স্বকীয়তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বান্দরবান জেলা পরিষদ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সম্মতি এবং সংশ্লিষ্ট মৌজা হেডম্যানের সুপারিশ ব্যতিরেকে ভূমির মালিকানা হস্তান্তরে সম্মতি প্রদান করতে পারে না। যদি উক্ত পরিষদ এরূপ সম্মতি প্রদান করে থাকে তাতে Principle of Natural Justice লংঘন করেছে বলে প্রতীয়মান হবে, যেহেতু পরিষদের সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে পরিষদ তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব নিজ এবং সংশ্লিষ্ট জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রতিপালন করতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন, ১৯০০; বান্দরবান জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন ২০০১, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় তাদের স্বার্থবিরোধী এমন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। এটি একই সাথে বাংলাদেশের সংবিধানেরও পরিপন্থি। কেননা সংবিধানে জনগণের জীবনের, সম্পত্তির এবং পেশার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, আন্দোলনরত ম্রো জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আন্দোলন ও প্রতিবাদ বন্ধ করার জন্য ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। বলে অভিযােগ উঠছে যা সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে ম্লান করবে বলে আমরা মনে করি।
এমতাবস্থায়, আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীগণ ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, প্রাকৃতিক সম্পদে প্রথাগত অভিগম্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। আমরা ম্রো অধ্যুষিত এলাকায় ম্যারিয়ট হোটেল ও বিনোদন পার্ক নামক প্রকল্পটি অবিলম্বে বাতিলের জোর দাবি জানাচ্ছি এবং এ প্রকল্প থেকে সকল প্রকার সম্পৃক্ততা প্রত্যাহার করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি আহবান জানাচ্ছি। আন্দোলরত জনগোষ্ঠীকে সেনাবাহিনীর নামে ভয়- ভীতি প্রদর্শন ও নানা ধরনের হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তা অবিলম্বে খতিয়ে দেখে বন্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ সম্পর্কে সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করছি।
শুধুমাত্র গোষ্ঠী ও ব্যবসাযি়ক স্বার্থে, জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে, বান্দরবানের মতো সংবেদনশীল পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থায় পরিচালিত পর্যটনসহ অন্যান্য সকল অননুমোদিত অর্থনৈতিক কর্মকান্ড অবিলম্বে স্থগিত করার এবং এমন সকল কর্মকান্ডের জন্য দখলকৃত সকল ভূমি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদের দাবি জানাচ্ছি।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের অব্যাহত ভূমি আগ্রাসন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিসমূহকে সুরক্ষা দিতে অবিলম্বে ভূমি কমিশন কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি।
বিবৃতি প্রদানকারীগণ হলেন, (১) প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রফেসর, এমেরিটাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২) সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী; (৩) খুশি কবির, সমন্বয়কারী , নিজেরা করি। (৪) ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী সভাপতি পিপিআরসি: (৫) ড, জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র (৬) ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গর্ভনর, বাংলাদেশ ব্যাংক, (৭) ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি, (৮) রাজা দেবাশীষ রায়, চাকমা রাজা, ব্যারিস্টার এট ল, (১৯) রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক: গণস্বাক্ষরতা অভিযান, (১০) ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন, (১১) ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মানিত ফেলো, সিপিডি (১২) ড. মুস্তাফিজুর রহমান, সম্মানিত ফেলো, সিপিডি, (১৩) শিরিন হক, সদস্য, নারীপক্ষ, (১৪) প্রফেসর আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, (১৫) প্রফেসর এম এম আকাশ, অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৬) শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। (১৭) ড. পারভীন হাসান, ভিসি, সেন্ট্রাল উইমেন বিশ্ববিদ্যালয়, (১৮) প্রফেসর ফেরদৌস আজিম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় (১৯) ড. আসিফ নজরুল, প্রফেসর আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, (২০) ড. হামিদা হোসেন, নারী অধিকার কর্মী, (২১) ড. শাহদীন মালিক, এডভোকেট, সুপ্রীমকোর্ট, (২২) রেহনুমা আহমেদ, লেখক, (২৩) মেঘনা গুহঠাকুরতা, গবেষক, (২৪) প্রফেসর শাহনাজ হুদা, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, (২৫) আমেনা মহসিন, প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, (২৬) প্রফেসর ড. সি আর আবরার,(২৭) ড. ইমরান মতিন, নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গর্ভনেন্স ও ডেভেলপমেন্ট (২৮) ড. তাসনিম সিদ্দিকী, প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ন্যাশনাল রামরু,(২৯) ড. ইমরান রহমান, প্রাক্তন ভিসি, ইউল্যাব, (৩০) মির্জা তাসলিমা সুলতানা, প্রফেসর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, (৩১) গীতিয়ারা নাসরিন, প্রফেসর, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। (৩২) ড. স্বপন আদনান, গবেষণা সহযোগী, সোয়াস, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়, (৩৩) শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী ও লেখক, (৩৪) শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি, (৩৫) সারা হোসেন, এডভোকেট সুপ্রিমকোর্ট, (৩৬) জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ, (৩৭) রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী, কোস্ট, (৩৮) নুর খান, সাধারণ সম্পাদক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, (৩৯) মহিউদ্দিন আহমেদ, লেখক ও গবেষক। (৪০) রেজাউর রহমান লেলিন, অধিকার কর্মী ও গবেষক (৪১) অরূপ রাহী, কবি, লেখক ও গায়ক (৪২) মাহরুখ মহিউদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সিটি প্রেস লি., (৪৩) তাসাফি হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা, বহ্নিশিখা; (৪৪) সামিনা লুৎফা, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। (৪৫) সঞ্জীব দ্রং নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, (৪৬) রিপন বানাই, কর্মসূচি সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, (৪৭) জুয়ামলিয়ান আমলাই, সভাপতি, বান্দরবান চ্যাপ্টার, পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার আন্দোলন (৪৮) অজয় এ মৃ সভাপতি, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ, (৪৯) মুক্তশ্রী ঢাকমা, পরিচালক, স্পর্কি, (৫০) গৌতম দেওয়ান, সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি, (৫১) লুবনা মরিয়ম, পরিচালক, সাধনা, (৫২) নায়লা খান, পরিচালক, ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইন্স সেন্টার, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন (৫৩) ওমর তারেক চৌধুরী, লেখক (৫৪) নবনীতা চৌধুরী, উন্নয়ন কর্মী, (৫৫) আনুশেহ আনাদিল, সুরকার, (৫৬) সাইদিয়া গুলরুখ, সাংবাদিক (৫৭) মাহমুদ রহমান, আলোকচিত্রী, ম্যাপ-মনটা; (৫৮) মাহবুবা আখতার, উপ-পরিচালখ ব্লাস্ট, (৫৯) এডভোকেট তাজুল ইসলাম, উপদেষ্টা, এডভোকেসী এবং ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, ব্লাস্ট (৬০) নিনা গোস্বামী, সিনিয়র উপ-পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র। (৬১) মো. শাহিনুজ্জামান, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, (৬২) সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, এডভোকেট, সুপ্রীমকোর্ট ও প্রধান নির্বাহী, বেলা।



