জাতীয়শিরোনাম

সাবধান একাধিক পাসপোর্টধারীরা

কেলেঙ্কারি ও শৃঙ্খলা ভঙের দায়ে কর্মকর্তাসহ ৬ জন চাকরিচ্যুত
ব্যবসা, ভ্রমণ, চাকরি বা শিক্ষা অর্জনের জন্য এক দেশ থেকে অন্যদেশে যেতে হলে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হচ্ছে পাসপোর্ট। সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও পাসপোর্ট যদি ঠিক না থাকে তবে কোনোভাবেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া যাবে না। এ কারণে পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। নির্ভুল, নির্ভেজাল ও হয়রানিমুক্ত পাসপোর্ট এখন হাতের নাগালেই। পাসপোর্ট অফিসের অভ্যন্তরে সব ধরনের সেবার ব্যবস্থা রাখা আছে।
এদিকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পাসপোর্ট প্রদানের ফলে একাধিক পাসপোর্টধারী কিংবা পাসপোর্ট প্রত্যাশীরা সাবধান। এক্ষেত্রে নিজের ফান্দে নিজেই পড়বে। একাধিক পাসপোর্টধারীরা চিহ্নিত হচ্ছেন এমন উদাহরণ অনেক। আর আবেদনকারীদের অসচেতনতা কিংবা কুটকৌশলের দায় এসে পড়ছে পাসপোর্ট কর্তৃপেক্ষর ওপর।
জানা গেছে, এক সময় পাসপোর্ট মানেই ছিল হয়রানি। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ইস্যু সংক্রান্ত কর্মকান্ড দালাল ও অসাধু চক্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অধিক নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও সহজপ্রাপ্যতার জন্য যন্ত্রে পাঠযোগ্য এমআরপি ইস্যুর কার্যক্রম হাতে নেয়া হলেও গ্রাহক হয়রানি ছিল প্রচন্ড। এছাড়া পাসপোর্ট কেলেঙ্কারির ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে পাসপোর্ট জালিয়াতির যে কেলেঙ্কারি ফাঁস হয় সেটি ছিল ভয়াবহ। তখন পরিচালক পাসপোর্ট ও সহকারী পরিচালকসহ ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে সহকারী পরিচালকসহ দুই জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এরপর পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে মেজর জেনারেল মাসুদ রিজওয়ান যোগদান করার পর পাসপোর্ট অফিসকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরিচালক পাসপোর্টের দায়িত্ব পান এটিএম আব্দুল আসাদ। এরপর নির্ভুল, নির্ভেজাল ও হয়রানিমুক্ত পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে একগুচ্চ পরিকল্পনা হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হয়। এর প্রেক্ষিতে পাসপোর্ট প্রদানে স্বচ্ছতা এসেছে। বয়স্ক, নারী, প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাসপোর্ট অফিসের অভ্যন্তরে এখন কোন ধরনের অনিয়ম কিংবা হয়রানির সুযোগ নেই। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে তা সমাধানের জন্য আলাদা সেল খোলা হয়েছে। তবে বাইরে দালালদের তত্পরতা আছে। এটা বন্ধেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার আগারগাঁও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি ৪ ঘণ্টা অবস্থান করেন। তিনি পাসপোর্ট আবেদনকারীদের সঙ্গে আলাপ করেন এবং তারা সুন্দর সুষ্ঠু পরিবেশের কথা জানান। এই ধরনের পরিবেশ অতীতে ছিল না এবং আবেদনকারীরা সুন্দর পরিবেশের কথা লিখিত আকারে রেজিস্ট্রারে উল্লেখ করেছেন।
পাসপোর্ট একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। এক্ষেত্রে কেউ একবার পাসপোর্ট করার পর পরবর্তীতে আবার ভিন্ন তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছেন। আর এটা পাসপোর্ট অফিসের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। কেউ পাসপোর্টে বিদেশে গেলে ওই দেশে তার ফিঙ্গার প্রিন্ট, ছবিসহ সার্বিক তথ্য চলে যায়। পরবর্তীতে ভিন্ন তথ্যে পাসপোর্টে গেলে ধরা তো পড়তেই হবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তা নির্ণয় করার উদ্যোগ নিয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। একাধিক পাসপোর্ট করতে গেলেও এখন ধরা পড়বেন সবাই। তাছাড়া এক্ষেত্রে নিজের ভুলে নিজেই বিপদে পড়তে হবে।
নিজের ভুলে দুর্ভোগের অন্ত নেই। বাংলাদেশী এক নাগরিকের নাম ও জন্ম তারিখ আংশিক পরিবর্তনের কারণে ভ্রমণ ভিসা প্রদান করতে অস্বীকার করে সিঙ্গাপুর। তার পূর্বের পাসপোর্টে নাম হোসেন মোহাম্মদ কবির, জন্ম তারিখ ১/১২/১৯৭১ ছিল। পরবর্তী পাসপোর্টে তার নাম কবির হোসেন, জন্ম তারিখ ১/১২/১৯৭০। আরেক বাংলাদেশ মোহাম্মদ জুলহাস, জন্ম তারিখ ১/৬/১৯৮৩ উল্লেখ করে ইস্যুকৃত হাতের লেখা পাসপোর্ট নিয়ে মরিশাস ভ্রমণ করেন। পরে তিনি কেবলমাত্র জন্মসাল ১৯৮৩ এর স্থলে ১৯৮২ উল্লেখ করে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট নিয়ে পুনরায় মরিশাস গমন করেন। তিনি সে দেশে রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন করলে মরিশাস পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ জন্মতারিখের অমিল দূর করে আবেদন করার নোটিশ প্রদান করেন। বাংলাদেশী নাগরিক জাহাঙ্গীর বাউলের হাতের লেখা পাসপোর্টে জন্ম তারিখ ছিল ১/৩/১৯৬৮। পরে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিল রেখে ৩/১০/১৯৬৮ জন্ম তারিখ উল্লেখ করে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। বিলেত ভ্রমণের প্রত্যাশায় ঢাকাস্থ বৃষ্টি হাইকমিশনে ভিসার আবেদন করলে জন্মতারিখে ভিন্নতার কারণ দেখিয়ে তা বাতিল করা হয়। ফাহমিদা আহমেদ ২০১০ সালে আবেদন করে একটি মেডিশন রিডেবল পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। ২০১৩ সালে নামের বানানে সামান্য ভিন্নতা এবং জন্ম তারিখ ১৮/১০/১৯৮৭ এর বদলে ১/১/১৯৯০ উল্লেখ করে দ্বিতীয় এমআরপি গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় এমআরপিটি হারানো ঘোষণা দিয়ে একই তথ্যে তৃতীয় এমআরপি গ্রহণ করেন। পরে বাবা ও মায়ের নামের একটি করে অক্ষর পরিবর্তন করে চতুর্থ এমআরপি গ্রহণ করেন। পঞ্চম এমআরপিতে উল্লেখিত জন্মতারিখ দ্বিতীয়বারের মতো ১/১/১৯৯০ এর বদলে ১৮.৯.১৯৯০, মায়ের নাম আলপোনা আহমেদের বদলে হালিমা আখতার, স্থায়ী ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে ষষ্ট এমআরপির আবেদন করেন, যা বর্তমানে পেন্ডিং আছে। ফাহমিদা আহমেদ হাতের লেখাসহ ৬টি পাসপোর্ট করেও তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি।
এরূপ কয়েকজন ফাহমিদা থাকলে পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা ধুলোয় মিশাতে বেশি সময় লাগবে না বলে সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য। নাজমা বেগম ২০১২ সালে বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, রাজশাহীতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট এর আবেদন করেন। তার স্থায়ী ঠিকানা নাটোর জেলা। কিন্তু তিনি আবেদনপত্রে সে তথ্য গোপন করার কারণে পুলিশ প্রতিবেদনে আপত্তি থাকায় প্রার্থিত পাসপোর্টটি পাননি। পরবর্তীতে তিনি স্থায়ী ঠিকানা গাজীপুর এবং বর্তমান ঠিকানা কাজীপড়া, ঢাকা উল্লেখপূর্বক বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, আগারগাঁও, ঢাকায় পুনরায় আবেদন করেন। কিন্তু আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করার সময় তিনি পূর্ববর্তী আবেদনের (রাজশাহী) তথ্য লুকান। এ কারণে আগারগাঁওয়ের আবেদনপত্রটি সিস্টেমে আটকা পড়ে। দীর্ঘদিন পাসপোর্ট না পাওয়ার বিষয়টি অফিস কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত না করেই নাজমা বেগম আগস্ট/২০১৬ সালে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কার্যক্রমের ওপর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আয়োজিত গণ-শুনানিতে পাসপোর্ট না পাওয়ার বিষয়ে হয়রানির অভিযোগ তোলেন। এরপর নাজমা বেগমের আবেদন বিশেষ বিবেচনায় নিস্পত্তি করে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। কিন্তু পাসপোর্ট বিতরণকালে নাজমা বেগমের পাসপোর্টে পিতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানা সম্পূর্ণ ভুল হয়েছে মর্মে ধরা পড়ে। নাজমা বেগম তখন এফিডেভিট করে সঠিক পিতার নাম ও সঠিক স্থায়ী ঠিকানা গাজীপুরের স্থলে নাটোর উল্লেখ করে পাসপোর্ট পুনরায় ইস্যুর আবেদন করেন। পিতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানা সম্পূর্ণ পরিবর্তনের কারণে আবেদনপত্রটি নিস্পত্তির জন্য বিধি মোতাবেক পুলিশের মতামতের জন্য পাঠানো হয়। পরে পুলিশ কর্তৃপক্ষ তার বর্তমান ঠিকানা ‘সঠিক নয়’ মর্মে মতামত প্রদান করে। এভাবে নাজমা বেগম তার অসচেতনতা ও অজ্ঞতার কারণে সঠিক তথ্যে পাসপোর্ট পেতে জটিলতার জালে আটকা পড়েন।
জানা গেছে, বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, আগারগাঁও, ঢাকাতে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮শ’ আবেদন জমা হচ্ছে। এতে আবেদনকারীদের সরাসরি সাক্ষাত্কারপূর্বক যাচাই-বাছাই করে আবেদনপত্র গ্রহণ করা হয়। রাজধানীর আগারগাঁও ও যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগে পাসপোর্ট অফিস সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, হয়রানির কোন চিত্রই। সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন, জরুরি পাসপোর্ট গ্রহণ, সংশোধন এবং নবায়ন সব কাজেই শৃঙ্খলা এসেছে। তবে পাসপোর্ট অফিসে স্বাচ্ছতা আসলেও এখনো পুলিশি ভেরিফিকেশন নিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেকে। ভেরিফিকেশনের বিভিন্ন ক্যাটাগরি থাকে। তবে সবক্ষেত্রেই হয়রানি আছে এখনো।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক (পাসপোর্ট) এটিএম আবু আসাদ জানান, পাসপোর্টে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে। হয়রানি বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে আমরা কঠোর। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ইতিমধ্যে ৪ জন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button