আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

সত্য যাই হোক আমাদের তা খুঁজে বের করতে হবে

কাজল ঘোষ
আমাদের একটি সত্য নিয়ে কথা বলতেই হবে; আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ খুব নিষ্ঠুর আচরণ করে। সত্য যাই হোক না কেন আমাদের তা খুঁজে বের করতে হবে। স্মার্টফোনের বদৌলতে কোথায় কী হচ্ছে দুনিয়ার সর্বত্র মানুষ খুব সহজেই জেনে যায়। কী ঘটছে মানুষের তা না জানার সুযোগ নেই। যখন অফিসফেরত কোনো নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গকে ওয়াল্টার স্কটে পেছন থেকে গুলি করে হত্যার ভিডিও দেখি তখন তা উপেক্ষা বা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। আমরা উপেক্ষা করতে পারি না পিলান্ডো ক্যাসিলির গার্লফ্রেন্ডের সেই ভয়াবহ কান্নাকে- যেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তা পিলান্ডোর ড্রাইভারের লাইসেন্সের জন্য সাত রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল। সে সময় গাড়ির পেছন সিটে বসা ছিল তার চার বছর বয়সী মেয়ে। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে মা, সব ঠিক হয়ে যাবে…।’ আমি তোমার পাশে আছি- এই বলে হৃদয় নিংড়ানো আর্তি জানায় ছোট শিশুটি।
আমরা ভুলতে পারি না ইরিক গার্নারের সেই সজোরে চিৎকার, ‘আমি দম নিতে পারছি না।’ পুলিশ তাকে সিগারেট বিক্রয়ের অপরাধে আটক করে শ্বাসরোধে হত্যা করে।
আমাদের স্মরণ করতেই হবে সেইসব হৃদয়বিদারক ঘটনা যা দিনের পর দিন ঘটে চলেছে। আর সেইসব ঘটে যাওয়া ঘটনার রহস্য রয়ে গেছে আড়ালেই। যার কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। রাস্তার নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব যেখানে পুলিশের সেখানে তারাই যদি হত্যা, মারধর আর নির্যাতন করে তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে, আমরা একটি মুক্ত ও নিরাপদ সমাজে বাস করছি?
যেখানে পুলিশ অপরাধমূলক কাজের জন্য আটক হয় তখন কীভাবে বলবো যে, সমাজে ন্যায়বিচার আছে। মিনেসোটার যে পুলিশ কর্মকর্তা পিলান্ডো ক্যাসিলিকে গুলি করেছিল এটি ছিল একটি সেকেন্ড ডিগ্রি হত্যাকাণ্ড। কিন্তু তাকে খালাস দেয়া হয়েছিল। ওহিওতে একটি গাড়ির পেছনে ধাওয়া করার পর নিরস্ত্র টিমোথি রাসেল ও ম্যালিসা উইলিয়ামসকে লক্ষ্য করে ৪৯ রাউন্ড গুলি ছোড়ে পুলিশ। কিন্তু সেই পুলিশ কর্মকর্তা অভিযুক্ত হওয়ার পরও খালাস পেয়ে যায়। পেনসিলভ্যানিয়াতেও পুলিশ এক নিরস্ত্র ড্রাইভারকে গুলি করে হত্যা করে। তাকেও হত্যার অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় পুলিশকে যদি এভাবে দায়মুক্তি দেয়া হয় তাহলে পুলিশের কাছে কি বার্তা যাবে এবং কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ও কি বার্তা পাবে?
জননিরাপত্তা নির্ভর করে নাগরিকদের আস্থার ওপর আর তা নির্ভর করে যদি মানুষ ভাবতে পারে সে সততা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। এটা নির্ভর করছে বিচার ব্যবস্থা আপত্তি সত্ত্বেও কতোটা নিরপেক্ষতা নিয়ে কাজ করছে। এটা নির্ভর করে আমাদের সংবিধানে কতখানি কাজ হচ্ছে?
কিন্তু যখন কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের শ্বেতাঙ্গ সমকক্ষদের চেয়ে অধিক হারে সন্দেহের শিকার, গ্রেপ্তার এবং অভিযুক্ত হচ্ছেন, যখন পুলিশ বিভাগ সামরিক বাহিনীর মতো আচরণ করছে, যখন তাদের হাতে হওয়া খুনের কোনো বিচার হচ্ছে না, তাহলে এটি তো অবিশ্বাস্য কিছু নয় যে, কিছু মানুষের সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস চলে যাবে?
আমি একথা বলছি একজন দীর্ঘ আইনি অভিজ্ঞতায় চলা মানুষ হিসেবে। আমি একথা বলছি, যিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রচণ্ড পরিমাণে সম্মান করেন। আমি জানি বেশির ভাগ পুলিশ কর্মকর্তাই তাদের অবদানের জন্য গর্ববোধ করার যোগ্যতা রাখে। আমি জানি তাদের কাজ কতো কঠিন এবং ভয়াবহ। দিনের পর দিন এসব কর্মকর্তাদের পরিবার তাদের ভালোবাসার মানুষের জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু হয়েছে এমন অসংখ্য মানুষের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু এটি একটি ভুল ভাবনা যে, আমাকে হয় পুলিশের পক্ষে থাকতে হবে, না হয় অভিযুক্তের পক্ষে থাকতে হবে। আমি উভয়ের পক্ষেই। আমি যত মানুষকে চিনি তাদের বেশির ভাগই উভয়ের পক্ষে। চলুন এ নিয়ে ঘটে যাওয়া কিছু সত্য কথা বলা যাক।
এতে কোনো ভুল নেই আমাদেরকে আমাদের এই বিচার ব্যবস্থা শোধরানো দরকার। আমাদেরকে আইন এবং আইনের ভিত্তির পরিবর্তন করতে হবে। আমাদেরকে এমন মানুষদের নির্বাচিত করতে হবে যারা এই মিশনে নামতে ইচ্ছুক। তাই প্রসিকিউটরের অফিসে উদারপন্থিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ এটি হচ্ছে আমাদের সিস্টেমের সবচেয়ে ক্ষমতাপূর্ণ কার্যালয়। তারা চাইলেই ঠিক করতে পারে তাদের কোন্‌ বিষয়টি নিয়ে কাজ করা উচিত। তারা চাইলেই করপোরেট প্রতারক থেকে শুরু করে যৌন হেনস্থাকারী যেকোনো সমস্যাতেই আলোকপাত করতে পারে। অপরাধীদেরকে জেলে নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাদের এবং একই সঙ্গে পুলিশের ক্ষমতাবহির্র্ভূতভাবে বল প্রয়োগ করে তদন্ত করার ক্ষমতা রয়েছে। আমাদের এমন মানুষ দরকার যারা এ ধরনের ক্ষমতাকে খর্ব করবে।
আমাদেরকে বাইরের চাপ প্রয়োগ করতে হবে যেখানে অন্য সংস্থাগুলোও অর্থপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। আমি যখন অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলাম তখন আমরাই ছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যারা পুলিশ অফিসারদের শরীরে ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করেছিলাম। এটা করেছিলাম কারণ এটিই সঠিক ছিল। কিন্তু আমি এটা করেছিলাম কারণ ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন আমাকে এটা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। রাস্তায় এ আন্দোলন চলার কারণে ভেতর থেকে আমি সুযোগ পেয়েছিলাম। এভাবেই পরিবর্তন আসে। আমিসহ আমার অফিসের কর্মকর্তারা যতখানি এই পরিবর্তনের পক্ষে অবদান রেখেছিলাম- রাস্তার সেই আন্দোলনও ঠিক ততখানি অবদান রেখেছিল। সামাজিক অধিকার নিশ্চিতের যে লড়াই শুধুমাত্র মনের আবেগ তাড়িতই নয় এটি খুবই কঠিন এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখা জরুরি এই আন্দোলনের জয় হয়তোবা ততখানি মধুর হবে না পরাজয় যত তিক্ত হবে। কিন্তু তারপরও নিজেকে সেই প্রথাবিরোধীদের একজন করতে হবে। যখনই আমরা হতাশ এবং নিরুৎসাহিত বোধ করতাম তখন আমরা বিচার ব্যবস্থার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী কনসটেন্স বেকার মটলির একটি উক্তি মনে করতাম। তিনি বলেছিলেন, উৎসাহের অভাব কখনও আমাকে নিরুৎসাহিত করেনি। তবে আমার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি একেবারেই উল্টো ছিল। আমি হচ্ছি সেই ধরনের মানুষ যে কখনও হাল ছেড়ে দেয় না।
কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি
‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে/
সুত্র : মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button