Uncategorized

লঞ্চে অগ্নিকান্ড অভিযান-১০’র মালিক হামজালাল শেখকে উঠানো হতে পারে আদালতে

মোঃ শাহাদাত হোসেন মনু,ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ অভিযান-১০ ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বৃহস্পতিবার মামলার নির্ধারিত ধার্য তারিখে গ্রেফতারকৃত ওই লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখকে ঝালকাঠির আদালতে হাজির স্বশরীরে হাজির করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঝালকাঠি সদর থানায় দায়েরকৃত মামলায়
বৃহস্পতিবার ধার্য তারিখে তাকে হাজির করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার এসআই নজরুল ইসলাম। ২৩ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে প্রায় ৮০০ যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি বরগুনা যাচ্ছিল। আগুনে পুড়ে ও নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ৪৯ যাত্রী নিহত হন। আরও ৩৫ জনের মতো এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন।
ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ নামে লঞ্চে অগ্নিকান্ডে প্রাণহানির ঘটনায় সোমবার (২৭ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিখোঁজ
যাত্রীদের স্বজন মনির হোসেন লঞ্চের মালিক, চালকসহ আটজনকে আসামি করে ঝালকাঠি সদর থানায় করা মামলা দায়ের করেন। দায়েরকৃত মামলায় আসামি করা হয়েছে অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখ, লঞ্চে থাকা দুই মাস্টার রিয়াজ সিকদার ও মো. খলিল, দুই ড্রাইভার মো. মাসুম ও কালাম, সুপারভাইজার মো.আনোয়ার, সুকানী আহসান এবং কেরানী কামরুল। মামলা বাদি মনির হোসেন জানান, ‘আগুনের ঘটনায় লঞ্চে থাকা যাত্রী তার ৩২ বছর বসয়ী বোন তাসলিমা আক্তার, দুই ভাগনি ১৫ বছরের সুমাইয়া আক্তার মীম ও ১০ বছরের সুমনা আক্তার তানিশা এবং ৭ বছর বয়সী ভাতিজা জোনায়েদ ইসলাম বায়জিদ এখনো নিখোঁজ আছে।’
এজাহারে বলা হয়, রাতে লঞ্চের ইঞ্জিনে যখন ত্রুটি দেখা দেয়, তখনও লঞ্চের স্টাফরা যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া তুলতে থাকেন। লঞ্চটির নিচতলার পেছনের অংশে থাকা ইঞ্জিন রুমে যখন আগুন ধরে যায় তখন চালক ও স্টাফরা যাত্রীদের বাঁচাতে লঞ্চ তীরে ভেড়ানো বা নোঙ্গর করার চেষ্টাটুকুও করেননি। বরং নিজেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে পালিয়েছেন। মামলায় লঞ্চটিতে নিরাপত্তা সামগ্রীর ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়। ঝালকাঠিতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় ২৫ ডিসেম্বর একই থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের গ্রামপুলিশ মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। এ ছাড়া একটি মামলা হয় রাজধানীর মতিঝিলের নৌ আদালতে। সে মামলায় লঞ্চের মালিক হামজালালকে নারায়নগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লঞ্চে অগ্নিকান্ড ও হতাহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ওই লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখকে ২৭ ডিসেম্বর নারায়নগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।
র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে হামজালাল জানান, লঞ্চটিতে নানা ধরনের ত্রুটি ছিল। লঞ্চটি দুর্ঘটনার এক মাস আগে রি-ইঞ্জিনিং করে আগের চায়নার ইঞ্জিনটি পরিবর্তন করে জাপানি রিকন্ডিশন দুটি ইঞ্জিন স্থাপন করা হয়। ইঞ্জিন স্থাপনের ক্ষেত্রে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা না নিয়ে লোকাল মেকানিকদের মাধ্যমে কাজ করানো হয়েছে। লঞ্চে ইঞ্জিনের অনুমোদন ছিল ১১০০ হর্স পাওয়ারের (দুই ইঞ্জিন মিলে)। কিš ‘বিআইডবিøউটিএ’র কোনো অনুমোদন না নিয়ে একেকটা ৭২০ হর্স পাওয়ারের দুটি ইঞ্জিন ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে । ইঞ্জিন স্থাপনের পর প্রথম ৭ ডিসেম্বর লঞ্চটির কোনো ধরনের ট্রায়াল ছাড়াই লঞ্চে যাত্রী পরিবহণ করা হয়। নতুন ইঞ্জিন লাগানোর পর সঠিকতা যাচাই করা হয়নি।
লঞ্চের কাঠামোগত অবস্থানের চেয়ে ইঞ্জিনের সক্ষমতা অনেক কম ছিল। যে কারণে শব্দ বেশি হতো, ইঞ্জিন গরম বেশি হতো। বিষয়টি বিভিন্ন সময় যাত্রীদেরও নজরে আসে। তাছাড়া তুলনামূলকভাবে লঞ্চের গতি অনেক বেশি ছিল। এই লঞ্চে রাতে ৪২০ জন যাত্রী পরিবহণের অনুমোদন ছিল। সেখানে দুর্ঘটনার দিন ৭০০ থেকে ৮০০ যাত্রী উঠানো হয়েছিল। সুগন্ধা নদীতে যাওয়ার আগে আরও দুটি পয়েন্টে যাত্রী নেমেছে। তবে সেই দুই পয়েন্ট থেকে আরও অধিকসংখ্যক যাত্রী উঠেছে। যে কারণে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে হয়েছে। ওই লঞ্চে ১২৭টি লাইফ বয় এবং মাত্র ২২টি লাইফ জেকেট ছিল। লাইফ জেকেটগুলো ছিল মূলত স্টাফদের জন্য। আর লাইফ বয়গুলোও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে না রেখে এক জায়গায় রাখা হয়েছিল। যে কারণে দুর্ঘটনার সময় যাত্রীরা সেগুলো হাতের কাছে পাননি।
লঞ্চ মালিক হামজালাল শেখ যখন দুর্ঘটনার প্রথম তথ্য পান, তখন রাত ৩টা। তাকে ম্যানেজার আনোয়ার ফোন করে জানান, লঞ্চে আগুন লেগেছে। এর ১৫ মিনিট পর তিনি তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, আগুন লাগলে মূলত লঞ্চ মাঝনদীতে না রেখে পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। লঞ্চটি এক পাড়ে নেওয়ার পর এর স্টাফরা নেমে পড়েন। তাদের সঙ্গে কিছু যাত্রীও নেমে যান। কিন্তু লঞ্চটি
নোঙর না করায় লঞ্চটি আবার ভেসে মাঝনদীতে চলে যায়। প্রায় ৪৫ মিনিট পরে লঞ্চটি ভাসতে ভাসতে নদীর অপর প্রান্তে চলে যায়। এই সময়ের মধ্যে চরম ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়। প্রথমেই যদি লঞ্চটি এ পাড়ে নোঙর করা হতো তবে এত জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হতো না। স্টাফরা লঞ্চে অগ্নি-দুর্ঘটনার বিষয়ে জানানোর পরও লঞ্চমালিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কাউকে অবহিত করেননি। ছাড়ার আগে হামজালাল লঞ্চে গিয়েছিলেন। তিনি স্টাফদের লঞ্চটি ট্রায়ালের বিষয়ে বলেছিলেন। এ কারণে লঞ্চটি দ্রæতগতিতে চালানো হয়েছিল। এই লঞ্চে দুইজন মাস্টার ও দুইজন চালক ছিলেন। তাদের মধ্যে দুজনের কোনো সনদ ছিল না। লঞ্চে জ্বালানি তেল ও লুব্রিকেন্ট ওয়েল সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা ছিল না।
জানা যায়, লঞ্চমালিক হামজালাল ১৯৮৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জাপানে ছিলেন। জাপান থেকে আসার পর ছোট একটি লঞ্চের মাধ্যমে এ ব্যবসা শুরু করেন। ২০১০ সালে অভিযান-৩, এরপর অভিযান-৫ নামে দুটি লঞ্চ কিনেন। এরপরে কিনেন অভিযান-১০লঞ্চটি। লঞ্চে তার মালিকানা ৫০ ভাগ। তার আরও তিনজন অংশীদার রয়েছেন, বাকি অংশ তাদের। লঞ্চের কাগজপত্র হালনাগাদ থেকে শুরু করে সব কাজ হামজালাল নিজেই করতেন। অভিযান-১০ লঞ্চটি দুই বছর ধরে ঢাকা-বরগুনা রুটে চলছে। এর আগেও এ লঞ্চটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিল। তখনও যাত্রীদের জীবন ঝুকিতে রেখে স্টাফরা চলে গিয়েছিলো।
ঝালকাঠি সদর থানায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নজরুল ইসলাম জানান, মামলার আলামত হিসেবে লঞ্চ এবং লঞ্চের মধ্যে পুড়ে যাওয়া অংশ বিশেষ জব্দ করা হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য নমুনা প্রেরণ করা হয়েছে। নারায়নগঞ্জ থেকে লঞ্চ মালিক হামজালাল শেখকে ২৭ডিসেম্বর সকালে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ওই মামলায় তাকে শোন অ্যারেস্ট (দৃশ্যমান গ্রেফতার) দেখানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ঝালকাঠি আদালতে মামলার ধার্য তারিখে তাকে স্বশরীরে উপস্থিত রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত। এর প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button