রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে তিন দফা প্রস্তাব চীনের

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মিয়ানমারের রাখাইনে অস্ত্রবিরতির ডাক দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার শিগগির একটি চুক্তি সই ও বাস্তবায়ন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তির বাস্তব সম্ভবনা রয়েছে উল্লেখ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বৈদেশিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক প্রধান (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ফেডিরিকা মোঘেরিনি বলেছেন, আমরা মনে করি সহিংসতা বন্ধ, উদ্বাস্তুদের স্রোতরোধ ও রাখাইন রাজ্যে মানবিক সংস্থাগুলোর পূর্ণ প্রবেশাধিকার রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের চাবিকাঠি। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ইইউ সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
রাখাইন সঙ্কট সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে জানান ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আজ সোমবার মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে এশিয়া-ইউরোপ মিটিং (আসেম) এর প্রাক্কালে দেয়া বক্তব্যে চীন ও ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এসব মন্তব্য করেন। ৫১টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন অং সান সু চি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
আসেমে যোগ দেয়ার আগে চীন, ইইউসহ জাপান, জার্মান ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। এর মধ্যে চীন ছাড়া বাকী পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। তবে সব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন। মাহমুদ আলীর সাথে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় ও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাতরাশ বৈঠক হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে অস্ত্রবিরতি কার্যকর করা, রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা ও আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যাতে মানুষ শান্তি থাকতে পারে এবং তাদের পালিয়ে যেতে না হয়। সব পক্ষের প্রচেষ্টায় প্রথম লক্ষ্যের ভিত্তি ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে। এখন পরিস্থিতি যাতে উত্তপ্ত হয়ে না ওঠে তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রথম লক্ষ্যটি অর্জিত হওয়ার পর উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসনের কার্যকর সমাধান বের করতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে আলোচনায় বসতে হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে দারিদ্র বিমোচনের মাধ্যমে রাখাইন সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কাজ করতে হবে।
রয়েটার্স জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিরাপদ কি না তা এখনো নিশ্চিত না। কেননা হাজার হাজার রোহিঙ্গা, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা ক্ষুধা ও রাখাইনের সহিংসতা থেকে বাঁচতে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ প্রত্যাগত রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়িতে ফেরানোর বদলে মিয়ানমারে প্রথমে তাদের একটি ‘আদর্শ গ্রামে’ রাখার পরিকল্পনা করছে। তবে জাতিসঙ্ঘ এ পদক্ষেপকে স্থায়ী ক্যাম্প বানানোর পরিকল্পনা হিসাবে সমালোচনা করেছে।
আনান কমিশনের প্রতিবেদনে দারিদ্র নিরসনে রাখাইনে বিনিয়োগ এবং সম্প্রদায়কেন্দ্রীক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সু চির উদ্যোগেই রাখাইন সঙ্কট নিরসনে জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়েছিল। গত ২৫ আগস্ট কমিশন তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আর সে রাতেই রাখাইনে পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে হামলার অজুহাতে পরদিন থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মত ভয়াবহ দমন-পীড়ন শুরু হয়। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার একে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় উদারহণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আসেমের উদ্বোধনীতে সু চি বলেন, অবৈধ অভিবাসীরা সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থা ছড়াচ্ছে, সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করছে, এমনকি পরমানু যুদ্ধের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। সংঘাত সামাজিক শান্তি নষ্ট করছে। এর পরিণতি হচ্ছে অনুন্নয়ন ও দারিদ্র। এটি জনগণ, এমনকি রাষ্ট্রের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি করছে।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙ্গালী সন্ত্রাসবাদী’ হিসাবে চিহ্নিত করে। তাদের মতে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে অনুপ্রবেশ করেছে। ২৫ আগস্টের ঘটনার জন্য মিয়ানমার সরকার বাঙ্গালী সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের অভিযানের কারণে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় ১০ লাখের বেশি উদ্বাস্তু বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।




