sliderযোগাযোগশিরোনাম

রেলের অন্দর মহলে কি চলছে?

প্রেস বিজ্ঞপ্তি: “ইঞ্জিন সংকট, ৭০ লোকোমোটিভ প্রকল্প বাতিলের পর এবার ৩০ লোকোমোটিভ ক্রয় প্রক্রিয়া ও এক্সেল লোড নিয়ে বির্তক, “রেলওয়েকে ব্যর্থ প্রমাণে সক্রিয় গোষ্ঠী, জনবল সংকট, ঘন ঘন ইঞ্জিন বিকল ও ট্রেন দূর্ঘটনা, সর্বোচ্চ পদ ঘিরে ‘নোংরা প্রতিযোগিতা” নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ২৮ জুলাই ২০২৬ মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোঃ মনিরুজ্জামান মনির বলেন, সংবাদ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বিশেষকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়; বরং বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান ভয়াবহ ইঞ্জিন সংকট, ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রকল্প বাতিলের কারণ, এডিবির অর্থায়নে ৩০টি নতুন লোকোমোটিভ ক্রয় প্রক্রিয়াকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক, রেলওয়ের প্রশাসনিক বাস্তবতা, ঘন ঘন ট্রেন দূর্ঘটনা, ইঞ্জিন ফেইল, সর্বোচ্চ পদ ঘিরে নোংরা প্রতিযোগিতা, জনবল সংকট এবং রেলসেবার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেশবাসির সামনে আপনাদের মাধ্যমে তুলে ধরা।

রেলওয়ের ভয়াবহ ইঞ্জিন সংকটের বাস্তব চিত্রঃ বর্তমানে রেলওয়ের বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে মিটারগেজ লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে।

রেলওয়ের যন্ত্রপ্রকৌশল শাখার বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন যাত্রী সেবার মান হ্রাস পাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ২৬৮ টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও গড়ে মাত্র ১৮০টি ইঞ্জিনের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ইঞ্জিন এর সংকটে প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলে ৩২টি পশ্চিমাঞ্চলে ৩৬টি মোট ৬৮টি ট্রেন বাতিল করছে রেলওয়ে কতৃপক্ষ। দীর্ঘদিন থেকে ইঞ্জিনের এরকম দুরবস্থা সত্বেও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আর এস) এর ইঞ্জিনের অতি জরুরি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ক্রয়ে দীর্ঘসূত্রিতা ও অদুরদর্শিতা বাংলাদেশ রেলওয়েকে ব্যর্থ প্রমাণে সক্রিয় দূর্নীতিবাজ চত্রুের সাথে আতাতের ষড়যন্ত্র হতে পারে এবং রেলওয়ে মহাপরিচালককে ব্যর্থ প্রমাণ করে নোংরা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রেলওয়ে মহাপরিচালক হওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রও হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

কারণ শুধু গত ডিসেম্বর মাসেই ৫৫টি ইঞ্জিন ফেইলের ঘটনা ঘটেছে। ইঞ্জিন ফেইল এর কারণে চলন্ত ট্রেন পথের মধ্যে বিলম্বিত হয়ে ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটছে এবং যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এতে রেলওয়ের সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি এবং রেলওয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। কোচের বগির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভেঙে যাওয়ার কারণে দূর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (RS) যন্ত্রাংশ ক্রয়ের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্দেশনা সঠিক ভাবে পালন করেননি তার প্রশাসনিক অদুরদর্শিতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি এবং বিলম্ব হচ্ছে। এমন অদক্ষতা অযোগ্যতা ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট আজ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

ট্রাফিক বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলে আন্তঃনগর, মেইল, কমিউটার ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রতিদিন প্রায় ৮৫টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সচল অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৭২টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন)। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৫টি লোকোমোটিভের ঘাটতি নিয়েই বাংলাদেশ রেলওয়েকে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে। যাত্রীসেবায়, কনটেইনার পরিবহনে, জ্বালানি তেল পরিবহনে, পণ্য পরিবহনে, সময়মতো ট্রেন পরিচালনায়। গত অর্থ-বছরের আয়-ব্যয়ের বিশ্লেষণেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। যাত্রী খাতে আয় ২৫৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেলেও পণ্য পরিবহনে আয় কমেছে।

আমরা মনে করি, প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ( ইঞ্জিন) সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে প্রতিটি ইঞ্জিন দিয়ে মাসে ৪-৫ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব এবং বছরে ৪০-৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব হতো। কিন্তু ইঞ্জিন সংকট এর কারণে রেলওয়ে প্রায় ৪০০-৫০০ কোটি টাকা আয় বঞ্চিত হচ্ছে। রেলওয়ের এই ইঞ্জিন সংকট চলতে থাকলে গত এক বছর পূর্বে বলেছিলাম আগামী দুই বছরের মধ্যে রেলওয়ে অচল হয়ে যাবে আজ আপনাদের বলছি ইঞ্জিন সংকট সমাধান করতে না পারলে আগামী এক বছরের মধ্যে রেলওয়ে সেবা মারাত্মক বিঘ্নিত হবে। ইঞ্জিন সংকট এর কারণে যাত্রী সেবার পাশাপাশি কন্টেইনার পরিবহন এবং উত্তরাঞ্চলে তেল পরিবহনও চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার জট সৃষ্টি হচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় প্রতিদিন বিকল হচ্ছে ট্রেনের লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন),কিন্তু লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন), সংকটের কারণে বর্তমানে চলমান ইঞ্জিনগুলোকে প্রয়োজনীয় Res: দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) বিকল হচ্ছে, ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব হচ্ছে, চলন্ত অবস্থায় লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) বিকল হয়ে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়ছেন।

এই বাস্তবতা শুধু যাত্রীসেবাতেই নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংগ্রহ প্রকল্প বাতিলের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পূর্বাঞ্চলের ইঞ্জিন সংকট অনেকাংশে দূর হতো। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা, দরকষাকষিতে ব্যর্থতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রকল্প পরিচালনায় দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। অন্যদিকে অনেকে মনে করছে, ৭০ ইঞ্জিন ক্রয় প্রকল্প বাতিল হওয়ার জন্য প্রকল্প পরিচালকসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়ী, কিন্তু তারা দায় শিকার না করে অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার জন্য দায়ী করছে। এই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

৭০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ক্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ বাংলাদেশে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনকে সম্পূর্ণ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করতে এখনও প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ শুধুমাত্র ডুয়েলগেজ প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে মিটারগেজ লোকোমোটিভের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি। বরং ৭০টি নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ত, অন্তত ২০৬০ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব হতো, এবং সে সময় ১ মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ৮২ টাকা, ফলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ কম খরচে ইঞ্জিন সংগ্রহ করা সম্ভব হতো।

৭০ লোকোমোটিভ প্রকল্প বাতিল হওয়ার পর এখন আশার আলো বর্তমানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)—এর অর্থায়নে ৩০টি নতুন মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এই ক্রয় প্রক্রিয়াকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দরপত্রের শর্ত, এক্সেল লোড, টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনসহ বিভিন্ন বিষয়কে সামনে এনে একটি গোষ্ঠী পুরো ক্রয় প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) শাখার ০২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের সরকারি পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ডিজাইন ক্যালকুলেশন অনুযায়ী নির্দিষ্ট রুটে ১৫ টন Axle Load বিবেচনায় লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) পরিচালনার কারিগরি সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।

১৩ মে ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ADB-এর পর্যবেক্ষণ, Specification যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ এবং রেলওয়ের মতামতের আলোকে সংশোধিত Technical Specification রেলপথ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। এরপর ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে রেলপথ মন্ত্রণালয় নীতিগত অনুমোদন প্রদান করে এবং যথাশীঘ্র ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ক্রয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করে। অর্থাৎ বিষয়টি ধাপে ধাপে কারিগরি মূল্যায়ন, ADB-এর পর্যবেক্ষণ এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান ইঞ্জিন সংকট নিরসনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর অর্থায়নে ৩০টি নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বিতর্ক, বিভ্রান্তি ও অভিযোগ সামনে আনছে দুর্নীতিবাজ চক্র। কোনো প্রকল্প সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন তথ্য, কারিগরি বিশ্লেষণ ও সরকারি নথির ভিত্তিতে হয়। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করা কখনোই জনস্বার্থের অনুকূল নয়।

আমাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) শাখার ০২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের কারিগরি মতামতে ডিজাইন ক্যালকুলেশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন সেকশনে Axle Load বহন ক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম সেকশনের নির্দিষ্ট অংশে ১৫ টন Axle Load বিবেচনায় পরিচালনা সম্ভব হলেও অন্যান্য পুরোনো মিটারগেজ সেকশনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অর্থাৎ এটি একটি কারিগরি মূল্যায়নের বিষয়, কোনো ব্যক্তিগত মতামতের বিষয় নয়। এক্সেল লোড নিয়ে বিতর্ক দরপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল Axle Load নির্ধারণ।

বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে নতুন রেললাইন নির্মাণ বা পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ব্রডগেজে ২৫ টন, মিটারগেজে ১৫ টন Axle Load বিবেচনায় রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের নতুন অংশে সেই মান অনুসরণ করা হলেও টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-দোহাজারীসহ পুরোনো অনেক সেকশনে এখনও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এই বাস্তবতা থেকেই Axle Load নিয়ে বিভিন্ন কারিগরি মতামত উঠে আসে। ADB-এর পর্যবেক্ষণ ১৩ মে ২০২৬ তারিখে রেলওয়ের মহাপরিচালকের মাধ্যমে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে Specification যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ, ADB-এর পর্যবেক্ষণ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের যান্ত্রিক বিভাগের মতামতের আলোকে টেন্ডারের Technical Specification পুনর্বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়। এতে Life Cycle Cost, Axle Load, Fuel Consumption, Qualification Criteria, Warranty, Local Training, Service Engineer, Contractual Experience, Cash Flow Capacity (জীবনচক্রের ব্যয়, এক্সেল লোড, জ্বালানি খরচ, যোগ্যতার মানদণ্ড, ওয়ারেন্টি, স্থানীয় প্রশিক্ষণ, সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার, চুক্তি সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, নগদ প্রবাহের সক্ষমতা) এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয় পুনর্মূল্যায়নের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এতে প্রতীয়মান হয় যে প্রকল্পটি একাধিক ধাপে কারিগরি যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদনঃ পরবর্তীতে ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে রেলপথ মন্ত্রণালয় নীতিগত অনুমোদন প্রদান করে। আদেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে কারিগরি নিবির্দেশ (Technical Specification) এর সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এবং পিপিআর, ২০২৫ অনুযায়ী ক্রয় প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, পক্ষপাতহীনতা, অসীমাবদ্ধকরতা, স্বচ্ছতা, সরকারি অর্থের সর্বোত্তম মূল্য, দক্ষতা, নৈতিকতা, গুনগতমান ও টেকসই ক্রয় সুনিশ্চিত করতে হবে। যথাশীঘ্র ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ক্রয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এটি প্রমাণ করে যে প্রকল্পটি শুধুমাত্র বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং ADB-এর পর্যবেক্ষণ, কারিগরি কমিটির সুপারিশ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদনের ভিত্তিতেই অগ্রসর হয়েছে। ৩০টি লোকোমোটিভ ক্রয় প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অভিযোগ উঠেছে যে দরপত্রের শর্ত, Axle Load এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ক্রয় প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) এর বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে Axle Load বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এমন অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং লোকোমোটিভের দামঃ লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) মূল্য নিয়েও বিভিন্ন আলোচনা হচ্ছে, তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনার সময় ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল প্রায় ৮২ টাকা। বর্তমানে তা প্রায় ১২৪ টাকা। স্বাভাবিক ভাবেই একই ধরনের যন্ত্রপাতি বাংলাদেশি মুদ্রায় কিনতে আগের তুলনায় বেশি ব্যয় হবে। এ কারণে শুধু মোট মূল্য তুলনা না করে ডলারের বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

রেলওয়ের বর্তমান বাস্তবতায় নতুন লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংগ্রহ বিলম্বিত হলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে যাত্রীসেবায়, পণ্য পরিবহনে, রাষ্ট্রীয় রাজস্বে, এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সুতরাং প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, তবে একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করাও উচিত নয়।

রেলওয়ের বর্তমান সংকট শুধু লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। রেলওয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, নিয়োগ ব্যবস্থা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কর্মকর্তাদের কাজের পরিবেশ নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রেলওয়ের নিয়োগ বিধিমালা দ্রুত সংশোধন প্রয়োজন বর্তমানে রেলওয়েতে প্রায় ৪৭,২৬০ জন কর্মকর্তা—কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন এবং ৮০০—এরও বেশি পদ বিদ্যমান।

কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে নিয়োগ বিধিমালা—২০২০—এ বিদ্যমান বিভিন্ন অসংগতি দীর্ঘদিন ধরে সংশোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশোধনের প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনিষ্পন্ন রয়েছে বলে জানা যায়। এর ফলে শূন্যপদ পূরণে বিলম্ব, জনবল সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, এবং রেলসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, নিয়োগ বিধিমালা ২০২০ সংশোধন এর জন্য গঠিত কমিটি গত ৫ বছরেও নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করতে না পারলেও ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিধিমালায় গত ৫ বছরে বিভিন্ন পদে হাজার হাজার নতুন জনবল নিয়োগ করলেও প্রায় ৬০% জনবল চাকরি ছেড়ে চলে গেছে কারণ বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি বিশেষায়িত কারিগরি প্রতিষ্ঠান এখানে মেধাবী নামের অযোগ্য জনবল নিয়োগের কারণে রেলওয়ের জনবল সংকট কাটছে না। অন্য দিকে রেলওয়ের পদ পদবি সম্পর্কে অভিজ্ঞ চাকরি পাওয়ার পূর্বেই অধেক প্রশিক্ষিত জনবলকে কৌশলে অধিকার বঞ্চিত করা হচ্ছে। রেলওয়ের আধুনিকায়নের পাশাপাশি নিয়োগ বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধনও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়োগ বিধিমালা ২০২০ সংশোধন এর জন্য মহামান্য হাইকোর্টে চলমান মামলার বিষয়টি রেলওয়ে কতৃপক্ষকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

রেলওয়ে এ্যাক্ট ১৮৯০ বাতিল করে নতুন আইন ২০২৬ প্রনয়নের উদ্যোগ বাংলাদেশ রেলওয়ের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র কি—না সেটা ভাবতে হচ্ছে, কারণ ইতিমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারছি বাংলাদেশ রেলওয়েকে বেসরকারি করণের জন্য রেলওয়ে আইন ২০২৬ প্রনয়ণ খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আমরা সন্দেহ পোষণ করছি, ত্রুটিপূর্ণ সাংঘর্ষিক স্বৈরাচারী বিতর্কিত নিয়োগ বিধিমালা ২০২০ এর মত রেলওয়ে আইন ২০২৬ করা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ অর্থাৎ মহাপরিচালক (Director General) পদকে কেন্দ্র করেও নানা আলোচনা—সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান মহাপরিচালক বাংলাদেশ রেলওয়ের জ্যেষ্ঠতম কর্মকর্তাদের একজন এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অধিকারী। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, কিছু কর্মকর্তা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বিভিন্ন মাধ্যমে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এই অপপ্রচার এর বিরুদ্ধে রেলওয়ের কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার মনে রাখতে হবে কোনো ব্যক্তির পদোন্নতির প্রতিযোগিতা যেন কখনোই বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন ও জনস্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা, বিশেষ করে যান্ত্রিক ও সরঞ্জাম বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কিছু সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন এমন দাবিও উঠেছে।
লাগেজ ভ্যান ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারের শত শত কোটি টাকার অপচয়ের অভিযোগে দুদকের দায়ের কৃত মামলা নং— ২৫ তারিখ ১৩ নভেম্বর /২৫ দ্রুত তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে যেন ভবিষ্যতে অন্য কেউ এধরণের অপচয়ের সাথে জড়িত না থাকে।

আমরা আশঙ্কা করছি— যদি এডিবির অর্থায়নে ৩০টি নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংগ্রহ বিলম্বিত হয় কিংবা কোনো কারণে স্থগিত হয়ে যায়, তাহলে পূর্বাঞ্চলের ইঞ্জিন সংকট আরও তীব্র হবে; আন্তঃনগর, মেইল ও কমিউটার ট্রেন পরিচালনায় সমস্যা বাড়বে; মালবাহী ট্রেন চলাচল ব্যাহত হবে; কনটেইনার পরিবহন ও জ্বালানি তেল সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে; রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে; এবং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাবে।

আমরা আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে জানাচ্ছি
১। ADB-এর অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ক্রয় প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
২। ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) প্রকল্প বাতিলের প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ ভাবে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করতে হবে।
৩। ৩০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ক্রয় প্রক্রিয়াকে ঘিরে উত্থাপিত সব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্ত ও ত্রুয় বানচালের ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৪। রেল বান্ধব বিধিমালা প্রনয়নে রেলওয়ের নিয়োগ বিধিমালা-২০২০ দ্রুত সংশোধন করে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটাতে হবে।
৫। রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ প্রতিষ্ঠানের অযাচিত প্রভাব থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তবে তা আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে হবে; একই সঙ্গে ভিত্তিহীন অভিযোগ বা অপপ্রচারের মাধ্যমেও যেন কর্মকর্তারা অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭। রেলওয়ের সর্বোচ্চ পদ ঘিরে নোংরা প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে।
৮। রেলওয়েকে ব্যর্থ করে বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমান করতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের গুপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা তদন্তের ভিত্তিতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি জাতীয় সম্পদ। এই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আধুনিক করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি কোনো ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থই হবে সর্বোচ্চ। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, পদোন্নতির প্রতিযোগিতা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা কিংবা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব যেন বাংলাদেশের রেলসেবাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। সরকারি নথি, তথ্য-উপাত্ত এবং আইনের ভিত্তিতে প্রতিটি বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হোক…এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ রেলওয়ে কারিগর পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এস কে বারী, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রাম মহানগরের সহ-সভাপতি আনোয়ারুল হক হনি, বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক হারুন-অর-রশীদ সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button