
রওশন হক
বাইরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ছাড়া আর কোনো শব্দ শুনা যায় না । মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ির চড়া লাইট । কুইন্সের জ্যামাইকার হিলসাইডে আমার বাসা।প্রথম লকডাউন হবার কথা শুনে ঠিক করেছিলাম বই পড়বো । ব্যয়াম করবো । সাথে রুপ চর্চা ও চলবে। কিনতু কিসের কি ! আমার অফিস ট্রামপের ইমারজেনসি সেক্টরে পরে গেল। আমাকে অফিস করতে হয়। অফিস করে এসে এমবুল্যনসের সাইরেন শুনে জানালার পাশে ছুটোছুটি করি ।রাতে ও ঘুম হয় না ।বই পড়তে চেষ্টা করি বাইরে সাইরেনের শব্দ শুনে পড়া বন্ধ করে দিই।
ঘরে বন্দী প্রবাসীরা এখন অপেক্ষা করতে থাকে। জানতে চায়, কী ঘটছে। সাইরেনের শব্দ ছাড়া যে বাইরের কিছু আর শুনতে পায় না মানুষ। তাই অপেক্ষায় থাকে, কখন ফেসবুকে আপডেট দেওয়া হবে।
কয়জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে? কয়জন আজ মারা গেলেন? কে কে মারা গেলেন? করোনায় প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে প্রতিবেশী, আত্মীয়-বন্ধুদের।
আত্মDয় স্বজন বন্ধু বান্ধব এখন হাসপাতালের শয্যা থেকে টেক্স করেন তাঁদের কারো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন এক মিনিটের জন্যও ভেন্টিলেটরের সাহায্য ছাড়া পারছেন না শ্বাস নিতে। মেসেজ পেয়ে কষ্টে বুক ভেংগে আসে ।টিভিতে সংবাদ দেখার চেষ্টা করি। আরও আগে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করলে এত মানুষ মরত না। দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট দোষ চাপান দেশের রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থার ওপর। তারা দোষ দিচ্ছে চীনের ওপর, ওরা সঠিক সময়ে আমাদের জানায়নি। এসব দেখে কষ্ট বাড়ে, এবার ভয় আরো বাডে ।মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। আমেরিকার ৯৬ শতাংশ মানুষ নিজেদের ঘরে বন্দী। আমেরিকার মানুষ এমন পরিস্থিতি দেখেনি আগে। বিশ্বের কেউ দেখেনি। মানুষ এমন পরিস্থিতিতে কী করবে ঠিক করতে পাচ্ছে না।
আমেরিকার নানা অঙ্গরাজ্যের মানুষ ছুটছে চার্চের দিকে। সামাজিক দূরত্বের কথা ভুলে গিয়ে জমায়েত হচ্ছে। আইন অমান্য করায় পুলিশ গ্রেপ্তার করছে যাজকদের। দিশেহারা নগরীর মানুষও। মানুষ অধৈর্য হয়ে উঠছে। এমন জীবনযাপনে মানুষ অভ্যস্ত নয়। এ জীবনযাপন নয়। মৃত্যুর হাতছানি চারদিকে। ফেসবুক, ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যুর ভিডিও প্রতিমুহূর্তে। এসবে নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ। অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে হয়তো নীতি প্রণয়ন হতো। এখন কারও সময় নেই তা দেখার। দ্রুত সব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। লাশ গাড়িতে ওঠানো হচ্ছে।
ভিডিও করে ছাড়ছে মানুষ। ঘরে বসে অনেকে অনিচ্ছায় এসব দেখছে। এসব দেখে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অসুস্থ হলে কী হবে? যাবে কোথায়? হাসপাতালগুলোর অবস্থা নাজুক।
দশ লাখের মতো আমেরিকান মারা যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে ।প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। প্রতি আড়াই মিনিটে একজন করে মানুষ মরছে প্রতিদিন। এ সংখ্যা বাড়ছে। জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নাকি এমন চলতে থাকবে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষও দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। ফোনে একে অপরের খবর নিচ্ছেন। মানুষের কণ্ঠে মৃত্যুর ভয় প্রকাশ পাচ্ছে। তারপরও আশা নিয়ে বেঁচে আছে মানুষ। দেরিতে হলেও নিউইয়র্কের মানুষ সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি বুঝেছে। পালন করছে কঠোরভাবে, যার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোয় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও ভর্তির সংখ্যা এখন নাকি কিছুটা কমেছে ।
নিউইয়র্কের সদা ব্যস্ত চেহারা একেবারে বদলে গেছে। আতঙ্কের মধ্যে আসছে শুধু সাইরেনের আওয়াজ। আর আছে অসহায় লোকজনের ফোনালাপ। স্বজন হারানোর কান্না।
এখন এখানে হাসপাতালে মৃত্যুর পর বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয়। করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া লোকজনের মরদেহ দেওয়া হয় না পরিবারকে। ফোনে সমাহিত করার স্থান জানাতে হয়। তারপর বেশ কিছু আইনি আনুষ্ঠানিকতার পর মৃতদেহকে সরাসরি কবরস্থানে পাঠানো হয়। বেশ দূরত্ব রেখে একান্ত কিছু স্বজন জানাজায় অংশ নেওয়া বা শেষ বিদায় জানানোর আয়োজনে থাকতে পারছেন। প্বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস লকডাউনে পর খাঁ খাঁ করছে। মোড়ের একমাত্র দোকান ‘জ্যাকসন হাইট ফার্মেসি’ খোলা পাওয়া গেল। কর্মরত স্বদেশি ওই নারী জানালেন, ফোনে সমানে ওষুধের অর্ডার আসছে। চিকিৎসকেরা প্রেসক্রিপশন পাঠাচ্ছেন অনলাইনে। দুই হাতে প্যাকেটবন্দী করার পর লোকজন এসে নিয়ে যাচ্ছেন। জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা না হলে বাংলাদেশি চিকিৎসকেরা চেম্বার বন্ধ রেখেছেন।
টেলিফোনে ও অনলাইনে সেবা দিচ্ছেন। অধিকাংশই হাসপাতালে চিকিৎসার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। জানা গেছে, বাংলাদেশি ডজন খানের চিকিৎসক নিজেরাই করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ চিকিৎসা নিচ্ছেন ঘরে, কেউ হাসপাতালে। এর মধ্যেই সুখবর হচ্ছে, কমিউনিটির পরিচিত চিকিৎসক আতাউল ওসমানী নিজ ক্লিনিক থেকে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন।
ব্রডওয়েতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান একদমই খোলা নেই। খোলা নেই ফেডেক্স বা ইউপিএস। মাস্ক পরা এক প্রবাসী কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছেন পূর্ব দিকে। ওই দিকে এলমাহার্স্ট হাসপাতাল। সেই হাসপাতালটি এখন যেন এক মৃত্যুপুরী। অনেক বাংলাদেশি এখানে মারা গেছেন। সামনে হাসপাতালের জরুরি সার্ভিসে কাজ করা একজন জানালেন, ভেতরের মেঝেতেও মরদেহ রাখা আছে।
ডাইভার্সিটি প্লাজায় এখন কোথাও কেউ নেই। অথচ সাধারণ সময়ে এখানে দক্ষিণ এশীয়দের ভিড়ে গমগম করে।
নিউইয়র্কের করোনা সংক্রমনের একটি বড় চেইন ।তবে বর্তমানে সামাজিক দূরত্ব পালনের ফলে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।
যদিও উৎকণ্ঠিত মেয়র ব্লাজিও মঙ্গলবার বলেছেন, ‘আসছে সপ্তাহে আমরা আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি হবে বলে আশঙ্কা করছি।’ মেয়রের আশঙ্কা, পরিস্থিতি মে মাস পর্যন্ত গড়াবে। নগরীর স্বাস্থ্য বিভাগের এক পরিসংখ্যান মতে, নিউইয়র্কে আক্রান্তদের অধিকাংশের বয়স ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে।
নিউইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোর ভাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গভর্নর বলছেন, ‘আমাদের লড়াইয়ের লক্ষ্য দুটো। একটি হাসপাতালে, অন্যটি নগরবাসীকে ঘরে রাখার।’ নিউইয়র্কে জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে যাওয়া, সমাবেশে যোগ দেওয়া, সব ধরনের পার্টির আয়োজন করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সুত্র : পূর্ব পশ্চিম ।




