sliderস্থানিয়

রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল পরিস্থিতি ‎

‎রতন রায়হান, রংপুর: উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও সুনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ—যা ১৯৯৭ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত—দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মান, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং পাবলিক পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে ওঠা একের পর এক অভিযোগ, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও শৃঙ্খলা ভাঙনের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলে।
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। অভিযোগ উঠেছে দলাদলি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আর্থিক অনিয়ম ও বিধিবহির্ভূত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে তৎকালীন অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা পারভীনকে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষক আলিউল করিম প্রামানিকের নেতৃত্বে একটি পক্ষ চাপ প্রয়োগ করে এ পদত্যাগপত্র আদায় করে এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক দায়িত্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

‎তবে একাধিক অনুসন্ধানে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি বলে জানা গেছে। সাবেক অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা পারভীন বলেন, “আমার দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ছিল প্রায় ৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা আমার বিদায়ের সময় ১৯ কোটিরও বেশি হয়। কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে আমি জড়িত নই।” অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে একাধিক তদন্ত হলেও তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং সংশ্লিষ্টদের না জানিয়ে গোপনে তদন্ত পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে, যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
শিক্ষক আলিউল করিম প্রামানিককে ঘিরে প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতীতে নানা অনিয়মের কারণে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলেও জানা যায়। বর্তমানে তিনি অসুস্থতার কারণে নিয়মিত উপস্থিত না থাকলেও ভাতা গ্রহণ করছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দলবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের ৫৪ জন শিক্ষক জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অনাস্থা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।

প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষিকা মানসুরা জাহান ধর্মীয় পোশাক পরিধান নিয়ে হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে প্রতিকার চাইলেও এখনো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সিনিয়র শিক্ষকদের উপেক্ষা করে বিধিবহির্ভূতভাবে নাসিরুল হক মিলনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‎এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গোপনীয়ভাবে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষক আলতাফ হোসেনকে পুনর্বহাল এবং তার নামে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা বকেয়া পরিশোধের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের রায় ও পূর্ববর্তী তদন্ত রিপোর্ট উপেক্ষা করে তাকে পুনর্বহাল করা হয় এবং পরবর্তীতে গোপনে এ অর্থ ছাড় করা হয়। আইনজীবীদের মতে, প্রক্রিয়াটি যথাযথ আইনি কাঠামো অনুসরণ না করলে তা গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।অভিযোগ রয়েছে, চলতি শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত আসনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়ার ফলে শ্রেণিকক্ষে চাপ বেড়েছে এবং শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ম অনুযায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা আরও প্রকট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতো, বর্তমানে সেখানে শৃঙ্খলার অবক্ষয়, দলাদলি, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।স্থানীয় সচেতন মহল, অভিভাবক ও শিক্ষকরা দ্রুত নবাগত জেলা প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপে এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবারও সুশাসন, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার মানে ফিরে আসবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button