আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

যেখানে অপেক্ষার শেষ নেই

কাজল ঘোষ
আমি যখন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি প্রতিটি দিনই দেখতাম পরিবারগুলো আদালত ছেড়ে বের হচ্ছে, রাস্তা পার হচ্ছে, জামিন সংক্রান্ত অফিসগুলোতে যাচ্ছে, জামিনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য যা করার তাই করছে, নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে হলেও জামিনের জন্য ঋণ নিশ্চিত করছে তারা। একইসঙ্গে বন্ধুদের কাছ থেকে তারা সাহায্য চাচ্ছে কিংবা চার্চে গিয়ে হাত পাতছে।
আমি এমনদেরও জানতাম যারা আত্মপক্ষ সমর্থন যোগ্য মামলাতেও দোষ স্বীকার করে নিচ্ছে বা দায় নিয়ে নিচ্ছে। যাতে করে তারা জেল থেকে বের হতে পারে এবং তাদের সন্তানদের কাছে ফিরতে পারে এবং কর্মজীবনে ফিরতে পারে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমি দেখেছি একজন সিঙ্গেল মাদার কীভাবে রিকারর্স আইসল্যান্ডে তার শিশুকে ঝুঁকিতে ফেলার দায়ে অভিযুক্ত এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে তার সন্তানকে তার বন্ধুর কাছে রেখে ডায়াপার কিনতে গিয়েছিল। এই তরুণ নারী দেড় হাজার ডলার পরিশোধ না করায় তার জামিন মেলেনি এবং যখন তিনি মুক্তি পান তখন তার শিশু সন্তানটি একটি অনাথ আশ্রমে। অন্য একটি ঘটনায় দেখা গেছে ষোলো বছরের কিশোর খালিফ ব্রডার ব্যাগ চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছে।
খালিফের পরিবার তিন হাজার ডলার দিতে না পারায় জামিন পায়নি এবং বিচার চলা অবস্থায় সে কারাবরণ করে। যতদিন না বিচার হয়েছে ততদিন তাকে কারাগারে থাকতে হয়। তাকে পরবর্তী তিন বছর বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারেই অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ এমন এক নির্জন কারাবাস যেখানে অপেক্ষার শেষ নেই। ২০১৫ সালের ঘটনা এটি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তা ছিল মর্মান্তিক। যখন সে রিকারর্স কারাগার থেকে চূড়ান্তভাবে মুক্তি পায় তখন সে আত্মহত্যা করে।
ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম দারিদ্র্যতার জন্য শাস্তি দিচ্ছে মানুষকে। এখানে ন্যায়বিচার কোথায়? এবং বিবেকইবা কোথায়?
২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কারাগারে থাকা ৯৫ জনই ছিল বিচার চলাকালীন আটক। এই মানুষগুলোর বেশির ভাগই সহিংস নয় এমন অপরাধের দায়ে আটক হয়েছে এবং এই নিরীহ মানুষগুলোকে আটকে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন ৩৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। কে জেল থেকে বের হবে বা কে জেলে থাকবে তা আসলে কার কত টাকা আছে তার ওপর নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। হিসাব বলছে কৃষ্ণাঙ্গদের শেতাঙ্গদের থেকে গড়পড়তা ৩৫ শতাংশ বেশি প্রদান করতে হয় জামিন নেয়ার ক্ষেত্রে। লাতিনদের ক্ষেত্রে এই হার বিশ শতাংশ। এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, আমাদের ব্যবস্থাই এমন।
২০১৭ সালে জামিন দেয়ার বর্তমান রীতি পরিবর্তনের জন্য সিনেটে একটি বিল আনি। কে কত টাকা জামিনের জন্য প্রদান করবে তা স্বেচ্ছাচারিভাবে নির্ধারণ করা হয়। এবং কাকে কাকে সমাজের জন্য বিপজ্জনক চিহ্নিত করা হবে এবং কাকে কাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে সেটি নির্ধারণের যে পদ্ধতি তাতে পরিবর্তন আনতে হবে। কেউ যদি দেশের জন্য হুমকি হয় তাহলে তাকে আটক করতে হবে। কেউ যদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চায় তাহলেও তাকে আটক করতে হবে। কিন্তু কেউ যদি এ দুটোর একটিও না পায় তবে তারও মুক্তির জন্য অর্থ আদায় করার কোনো অর্থ হতে পারে না। আমার এই প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলেন রিপাবলিকান সিনেটর র‌্যান্ড পল। বেশির ভাগ ইস্যুতেই তার সঙ্গে ছিল আমার বিপরীতমুখী অবস্থান। তবে এই ইস্যুতে তিনি ছিলেন আমার পক্ষেই। আমি বিশ্বাস করি সকলেরই তাই হওয়া উচিত। এটি এমন একটি ইস্যু যা রাজনীতির অনেক ওপরে। যেভাবেই হোক এটিকে বাস্তবায়ন করতেই হবে। এর আগে আমরা যেটি করেছি তা হলো মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে গাঁজা বৈধ করে দিয়েছি। এফবিআই’র হিসাবে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ সহিংসতার দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছে তার চেয়েও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে গাঁজার কারণে। শুধুমাত্র এক চিমটি গাঁজা রাখার কারণে ২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সত্তর লাখেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যাদের প্রায় সবাই ছিল অশ্বেতাঙ্গ। ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসে গাঁজা রাখার কারণে যত মানুষকে নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট আটক করেছে তার ৯৩ শতাংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। এই বর্ণবৈষম্য বিস্ময়কর এবং পুলিশের আচরণ অসমর্থনযোগ্য। তাই আমি মনে করি, আমাদের গাঁজা বৈধ করে দেয়া উচিত এবং এটি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। শুধুমাত্র গাঁজা রাখার কারণে যত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদেরকে মুক্তি দেয়া উচিত।

কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি
‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে/
সুত্র : মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button