
আসন্ন রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচনের সাতজন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে চারজনই (৫৭.১৪%) ফৌজদারি মামলার আসামি। প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুছের বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। মোস্তাফিজার রহমান ও সরফুদ্দীন আহম্মদের বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি মামলা ছিল। কাওছার জামানের বিরুদ্ধে বর্তমান মামলা আছে এবং অতীতেও ছিল। এটিএম গোলাম মোস্তফা, সেলিম আখতার ও হোসেন মকবুল শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই এবং অতীতেও ছিল না। মামলার বোঝা ঘাড়ে নিয়েই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তারা।
সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় নাগরিকদের সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
সুজনের গবেষণায় দেখা যায়, মামলার দিক থেকে কাউন্সিলর প্রার্থীদের অবস্থা আরো নাজুক। ২১২ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৫২ জনের (২৪.৫২%) বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা রয়েছে। এছাড়াও নয়জন কাউন্সিলর ৩০২ ধারায় হত্যা মামলার আসামি। বর্তমানে হত্যা মামলার আসামিরা হচ্ছেন, ১ নম্বর ওয়ার্ডের মো. রফিকুল ইসলাম, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মো. হাসানুজ্জামান, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কামরুল হাসান টিটু, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের এমরাউল হাসান এবং ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের নূরুজ্জামান জাদু। এছাড়াও অতীতে হত্যা মামলার আসামি ছিলেন ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মো. শাফিউল ইসলাম, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের খায়রুল ইসলাম এবং ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের নেছার আহমেদ ও ইদ্রিস আলী। নারী কাউন্সিলর ৬৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে বর্তমানে এবং তিনজনের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল।
নির্বাচন কমিশনের হলফনামা থেকে নেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুজন জানায়, সাতজন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে মো. সেলিম আখতার ও হোসেন মকবুল শাহরিয়ার এইচএসসি পাস। বাকিরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। তবে কাউন্সিলরদের মধ্যে ৮১ জন (৩৮.২০%) এবং নারী কাউন্সিলরদের মধ্যে ২৫ জনের (৩৮.৪৬%) শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে। গড়ে সব মিলে মোট ২৮৪ জনের মধ্যে ৩৭.৩২% প্রার্থী এসএসসি পাস করেননি।
প্রার্থীদের পেশা সম্পর্কে তিনি বলেন, সাতজন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই ব্যবসায়ী। সরফুদ্দীন আহম্মেদ পেশার ঘরে উল্লেখ করেছেন ‘রাজনীতি’। ২১২ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে শতকরা ৭০.৭৫% (১৫০ জন) ভাগের পেশাই ব্যবসা। কৃষির সাথে সম্পৃক্ত আছেন ২০ জন। ৬৫ জন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর প্রার্থীর অধিকাংশই বা ৪০ জন গৃহিণী। ১৪ জনের পেশা ব্যবসা। তিনটি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সর্বমোট ২৮৪ জন প্রার্থীর মধ্যে শতকরা ৫৯.৫০% ভাগই (১৬৯ জন) ব্যবসায়ী।
সুজন জানায়, প্রার্থীদের মধ্যে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার আয় অনেক কম। মোস্তফার চেয়ে বিএনপি প্রার্থীর বাবলার আয় অনেক বেশি হলেও তিনি ঋণগ্রস্ত। নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামা অনুসারে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টুর কোনো কৃষি জমি নেই। বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪৫ লাখ ৯৩ হাজার ১৪০ টাকা।
জাতীয় পার্টি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে তিন লাখ ৬৪ হাজার ২৭২ টাকা। এছাড়া জনতা ব্যাংকে তার নামে ১৫ লাখ টাকা ঋণ আছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের ভাতিজা হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন সাত লাখ ৩৫ হাজার টাকা। তার ব্যক্তিগত ঋণ আছে ১০ লাখ টাকা।
এ সময় সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এসব তথ্য নির্বাচন কমিশনে জমা প্রার্থীদের দেয়া হলফনামা থেকে পাওয়া গেছে। তথ্যগুলো একসাথে করে উপস্থাপন করেছে সুজন। তারা যদি ভুল কিংবা অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য দিয়ে থাকে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে অনুসন্ধান করে এগুলো যাচাইবাছাই করা। একইভাবে সাংবাদিকদেরও দায়িত্ব আছে এগুলোর সত্যতা যাচাই করা। আমরা রংপুর সিটি কর্পোরেশনের সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, আমরা আশা করছি রংপুরে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখানে ব্যালটে মারা কিংবা ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না বলে আমরা আশাবাদী।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি। সুজন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তথ্য তুলে ধরে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চাই। তবে শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকার, প্রশাসন ও ভোটারদেরও দায়িত্ব রয়েছে।’
জাকির হোসেন বলেন, ‘যে উদ্দেশ্যে হলফনামার বিধান প্রবর্তন করা হয়েছিল বর্তমানে সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। অনেক প্রার্থীই হলফনামায় সঠিক তথ্য দেন না। এছাড়া হলফনামায় অর্জনকালীন মূল্য উল্লেখ করা হয়, যার মাধ্যমে প্রার্থীর প্রকৃত সম্পদ নিরুপন করা যায় না।’ তাই হলফনামার ছকে পরিবর্তন আনা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আগামী ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মেয়র পদে সাত প্রার্থী, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১ এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সহ-সম্পাদক জাকির হোসেন এবং নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ উপস্থিত ছিলেন।




