মানিকগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে মশাল হাতে নিয়ে শপথ

মো.নজরুল ইসলাম,মানিকগঞ্জ প্রতিনিধ : মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত চেতনায় উজ্জিবিত হোক আজকের প্রজন্ম। আজ ১৩ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ পাক হানাদারমুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিন একে একে পাক হানাদাররা মানিকগঞ্জ থেকে পালিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। হানাদারমুক্ত হয় মানিকগঞ্জ এই দিনেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। দিনটিকে স্মরণ এবং নতুন প্রজন্মকে জাগ্রত করতে প্রতি বছর ১৩ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ দিনব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা হলেও বৈশি^ক মহামারী করোনাকালীন সংকট মোকাবিলায় এবারও মেলা হচ্ছে না।
যুদ্ধদিনের কথা-মানিকগঞ্জের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। মুক্তিকামী মানুষ ট্রেজারি থেকে ছিনিয়ে নেয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ এরপর ভারত থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মুক্তিযোদ্ধারা জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রতিরোধ শুর করেন। পাকবাহিনী, আলবদর, আলশামস, রাজাকারদের আক্রমণ, ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে মানিকগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা ২টি ব্যানারে কাজ করেন। সুষ্ঠভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য মানিকগঞ্জের তৎতকালিন আওয়ামীলীগের কান্ডারী ও এম এল এ এ্যাডভোকেট খন্দকার মাজাহারুল হক চান মিয়াকে চেয়ারম্যান করে আওয়ামীলীগের কান্ডারী ও এম এল এ এ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ নেতা ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হালিম চৌধুরী, ন্যাপ নেতা এ্যাডভোকেট খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, ন্যাপ নেতা সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ডা. মীর আবুল খায়ের ঘটু, আওয়ামীলীগ নেতা মফিজুল ইসলাম খান কামালকে নিয়ে ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এদের দক্ষ নেতৃত্বে মানিকগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। মানিকগঞ্জের বিভিন্ন যুদ্ধে ৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও ৯ জন মুক্তিসেনা চরমভাবে আহন হন। মানিকগঞ্জ সিএনবির ডাকবাংলো ছিল পাক হানাদার বাহিনীর সদর দফতর। এখান থেকেই হানাদার এবং তাদের দোসররা নিধনযজ্ঞ পরিচালনা করত। আর মূল ব্যারাক ছিল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পিটিআইয়ের মূল ভবনে।
আজকের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দিয়ে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ঢাকার দিকে ফিরতে শুর করেন। পরের দিন সকালে ১৪ ডিসেম্বর দেবেন্দ্র কলেজ মাঠ প্রাঙ্গনে তৎকালীন এম এল এ মাজাহারুল হক চাঁন মিয়ার নেতৃত্বে মানিকগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৭১ মালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্থানি সেনাবাহিনীর ক্র্যাক-ডাউনের খবর পাওয়ার পরপরই মানিকগঞ্জের বিপ্লবী কমান্ডের সিদ্ধান্তে মানিকগঞ্জ ট্রেজারীতে রক্ষিত অস্ত্র-গোলাবারুদ ও ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর লাইসেন্সকৃত বন্দুক-পিস্তল দিয়েই শত্রæর মোকাবেলা শুরু হয় এবং জেলা কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা যুদ্ধ পরিচালনা জন্য শপথ গ্রহণ করেন ।
মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে আরিচা ফেরিঘাট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু ১ এপ্রিল ৭১’ সালে হেলিকপ্টারে করে সেনা নামিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দখল করে নেয় পাক বাহিনী। ঐদিনের মধ্যেই মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়। জুলাই মাসে রাজাকার, আল-বদর ও শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। স্বাধীনতা বিরোধীরা পাকবাহিনীকে মানিকগঞ্জবাসিদের হত্যা, ধর্ষন ও ধংসযজ্ঞে সহায়তা করতে থাকে। ভারত থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রতিরোধ শুরু করেন। পাকবাহিনী, আল-বদর, আল-শামস, রাজাকারদের আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে মানিকগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধারা দু’টি সেক্টরে কাজ করেন। অক্টোবরের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সব কাজই অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে চলে। ১৭ জুলাই ঘিওর থানা আক্রমণ করে পাক সেনাদের আহত করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিজেদের দখলে আনে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। ১৮ আগস্ট হরিরামপুর থানায় প্রবেশ করলে মুক্তিবাহিনীর সাহসী গর্জনে পিছু হটে পাক বাহিনী।
১৩ অক্টোবর সিও অফিসে সংরক্ষিত পাকবাহিনী ক্যাম্প দখলের জন্য মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করলে পাকবাহিনী পরাজিত হয়। এ সময় পাক-বাহিনীর পাঁচ সদস্য মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ অবলম্বন করে। তখন পাকবাহিনীর ৭০টি রাইফেল, তিনটি এলএমজি ও সাত বক্স গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। পাকবাহিনী ক্যাম্প দখলের পর সেখানকার ওয়্যারলেস অফিস পুড়িয়ে দেওয়ার সময় আগুনে পুড়ে মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান শহীদ হন ও মুক্তিযোদ্ধা পান্নু মোল্লা আহত হন। ৫ অক্টোবর সিংগাইর থানার বায়রা নামক স্থানে ধলেশ্বরী নদীর উত্তর পাড় থেকে নৌকায় চলাচলকারী পাকবাহিনীর ওপর ব্রাশফায়ার করলে ১৫ জন পাকসেনা নিহত হন।
মানিকগঞ্জে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বলে খ্যাত সিংগাইরের গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধ। এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন ইঞ্জিনিয়ার তোবারক হোসেন লুডু। গোলাইডাঙ্গা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প দখলের জন্য তিন শতাধিক পাকবাহিনী ১০ থেকে ১২টি নৌকায় করে সেখানে আসে। এ খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অবস্থান নেয়। সেখানে দ্বিমুখী আক্রমণে একজন কর্নেলসহ ৮১ জন পাক সেনা মারা যায়। ১৪ অক্টোবর বালিরটেক ও ১৫ অক্টোবর সুতালড়িতে পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ হয়। বালিরটেক যুদ্ধে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
২২ নভেম্বর দেশীয় দোসর ও পাক হানাদার বাহিনী গভীর রাতে তেরশ্রী, সেনপাড়া, বড়রিয়া এবং বড়বিলা গ্রামের ঘুমন্ত মানুষের ওপর নারকীয় তান্ডব চালায়। নির্বিচারে গুলি, বেয়নেট চার্জ ও বাড়ি ঘরে আগুন দিয়ে তেরশ্রী জমিদার সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী এবং অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ ৪৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে বর্বর বাহিনী। ১০ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার মিরপুর গ্রামে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইসমাইল উদ্দিন মোল্লার বাড়ি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাকিস্থানী বাহিনী ও তাদের দোসররা অতর্কিত আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা আক্রমণ করলে প্রায় ২ ঘন্টা সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে ঘিওর অঞ্চলের কাউটিয়া গ্রামের সিংহ পুরুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা মুনসুর আলম খান গুলিতে আহত হন। এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনী এলাকার কোকারাম মন্ডলকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেয় এই গ্রামের প্রায় অর্ধশত বাড়িঘর।
দিবসটি উপলক্ষে প্রতি বছর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৫ দিন ব্যাপী বিজয় মেলা উদযাপন করা হয়। এ বছর করোনাকালীন সময়ের জন্য এ বিজয় মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তবে স্বল্প পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারি,বেসরকারি,রাজনৈতিক ও সাস্কৃতিক অঙ্গনে নানা কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে আজ রাত ১২.০১ মি.মানিকগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সকল রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে মানিকগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়(বিজয় মেলা মাঠে) শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও মশাল প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠিত হয়। মানিকগঞ্জ পাক হানাদার মুক্ত দিবসে মশাল হাতে শপথ হোক মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়তে। নতুন প্রজন্মের মাঝে বহুত্ববাদি সাংস্কৃতিক চর্চায় বিনির্মান হোক সামাজিক ন্যায্যতার নারীবান্ধব সমাজ।




