Uncategorized

মানিকগঞ্জের হাতে ভাজা সুগন্ধী মুড়ির কদর বেশি

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ: পবিত্র রমজানে ইফতারিতে ছোট-বড় প্রায় সবারই অন্যতম আকর্ষণ পিঁয়াজু, ছোলার সাথে সুস্বাদু মুড়ি মাখা। তবে যেনোতেনো মুড়ি হলে কি আর তৃপ্তি পাওয়া যায়? চাই ভেজালমুক্ত হাতে ভাজা মুড়ি। আর এই মুড়ির স্বাদ উপভোগ করতে হলে ছুটে যেতে হবে গ্রামে। গ্রামের গৃহিণীদের হাতে ভাজা স্বাদে ভরপুর ও সুগন্ধ এই মুড়ির কদর সারা বছরের চাইতে রমজানে বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তেমনি মানিকগঞ্জের নবগ্রাম ইউনিয়নের নবগ্রাম, ধলাই, উভাজানি, সরুপাই ও দৌলতপুর উপজেলার দৌলতপুর পূর্ব পাড়া গ্রামের গৃহবধুরা পরম মমতা দিয়ে এই মুড়ি তৈরি করছেন কয়েক যুগ ধরে। এসব এলাকার গৃহিণীদের এখন যেন দম ফেলার সময় নেই।
কিন্তু পুঁজির অভাব ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারছে না হাতে ভাজা মুড়ির কারিগররা। বাধ্য হয়ে অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছেন এ পেশা। তারা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, মুড়িকে আকর্ষণীয় ও আকারে বড় করতে শহরের ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছে ক্ষতিকারক হাইড্রোস।
সরজমিন মানিকগঞ্জ-হরিররমাপুর সড়ক সংলগ্ন সরুপাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আনোয়ারা বেগমের বাড়িতে হাতে ভাজা মুড়ির সুবাস। পরিবারের সবাই ব্যস্ত মুড়ি তৈরির কাজে। প্রথম রজমানের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই প্রতিদিন তারা ৩/৪ মণ মুড়ি মাটির চুলোয় ভেজে বিক্রি করছে। পাইকাররা এখান থেকে মুড়ি ক্রয় করে জেলা শহরের বড় বড় দোকানে নিয়ে বিক্রি করে থাকে। এছাড়া এই অঞ্চলের সুস্বাধু মুড়ির কদর এতোই বেশি যার ফলে জেলার গন্ডি পেরিয়ে তা চলে যাচ্ছে ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
শুধু হাজেরা বেগমের বাড়িতেই নয় এই গ্রামের কমপক্ষে আরো ১২টি বাড়িতে চলছে মুড়ি তৈরির ধুম।
মুড়ি কারিগর গৃহবধূ হাজেরা বেগম বললেন, আমারা এখানে যে মুড়ি ভাজি তার নাম ভুষিভাঙ্গা মুড়ি। হাতে ভাজা এই মুুড়িতে নেই কোন ক্ষতিকার পদার্থ। যে কারনে এই মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি। তবে রোজার সময় এর চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুন। এই মুড়ি প্রতিকেজি বিক্রি হয় ৮৫-৯০ টাকা। অনেক কষ্ট হয় তার পরও পুর্বের এই পেশাকে ছাড়তে পারি না।
অপর মুড়ি তৈরির কারিগর মো: ইউনুছ মিয়া জানান, ভুষিভাঙ্গা মুড়ির ধান আনতে হয় বরিশাল থেকে। সেখান থেকে প্রতিমণ ধান আনতে খরচ পড়ে যায় ১৩শ’ টাকার ওপরে। এক মণ ধানে ২২ থেকে ২৪ কেজি মুড়ি হয়। হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি করতে খুবই পরিশ্রম হয় ঠিকই কিন্তু এই মুড়ি বিক্রি করেই আমাদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। সারা বছরের চাইতে প্রতিবছর রমজান মাসে মুড়ির কদর বেশি থাকে।
দৌলতপুর উপজেলার দৌলতপুর পূর্ব পাড়া গ্রামের অনিতা শীল জানান, বাজারে মেশিনে সার দিয়ে ভেজাল মুড়ি তৈরি করায় আমাদের মুড়ি উৎপাদন অনেক কমে গেছে। কারণ ঐসব মুড়ি ৪০-৪৫ টাকায় পাওয়া যায়। আর আমাদের কাছ থেকে এক কেজি মুড়ি কিনতে হলে কমপক্ষে ৮০-৯০ টাকা লাগে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো: মজনু বিশ্বাস জানালেন, এই গ্রামগুলো মুড়ির গ্রাম হিসেবেই এক সময় পরিচিত ছিল। পতিটি বাড়িতে মুড়ি তৈরি করা হতো। বাতাসে ভেসে বেড়াতো মুড়ির সুবাসিত ঘ্রাণ। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আধুনিক মেশিন দিয়ে রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে মুড়ি উৎপাদন করায় এখানকার কারিগড়রা আর্থিকভবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই হাতে ভাজা মুড়ি তৈরিতে আগ্রহ কমে যাচ্ছে তাদের।
বিডিএম-এর অতিরিক্ত মহাসচিব ডা: মো: আবুল হাসান জানান, প্রতি ১০০ গ্রাম পরিমাণ মুড়িতে রয়েছে ৪০২ গ্রাম ক্যালরি, ৮৯.৮ গ্রাম শর্করা, ০.৫ গ্রাম ফ্যাট, কোলেস্টেরল নেই, ৬.৩ গ্রাম প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ৬ মি.গ্রা., ফসফরাস- ৬ মি.গ্রা., সোডিয়াম ৩ মি.গ্রা.। মানবদেহের জন্য এই পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ মুড়ি অনেক সহায়ক ও উপকারী।
বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড বাজারের পাইকারী দোকানি মো: গোলাপ খাঁন জানান, গ্রামের হাতে ভাজা মুড়ি মানুষের কাছে কদর বেশি। সেখান থেকে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় কিনে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। আর রমজান মাসে ইফতারের জন্য এই মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি। কারণ এই মুড়িতে কোনো ভেজাল নেই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button