ভারতের একতরফা সুবিধা আর বাংলাদেশের নতজানু নীতির অবসান প্রয়োজন
আমির হোসেন সজিব: স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা একটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক অনুশীলন। তবে এই সম্পর্ক কখনোই একপাক্ষিক হতে পারে না। বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থ রক্ষার নীতিতে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তবতা বহু বছর ধরেই সমান মর্যাদার পরিবর্তে একতরফাভাবে ভারতের সুবিধা নিশ্চিত করায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। বাংলাদেশ তার ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতের স্বার্থে বারবার নিজস্ব স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে—যা জাতীয় আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন নীতিমালার পরিপন্থী।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এখন এক নতুন চেতনা তৈরি হয়েছে—‘চোখে চোখ রেখে সম্পর্ক’, অর্থাৎ আত্মমর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ রিপোর্টে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা, জনগণের প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: বন্ধুত্ব না নির্ভরশীলতা?
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ভূমিকার অজুহাতে আজও যদি বাংলাদেশ তার স্বার্থ বিসর্জন দেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠে—এই বন্ধুত্ব কি সমান মর্যাদার নাকি একপাক্ষিক নির্ভরশীলতার?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দীর্ঘদিন
ধরেই ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান:
১. পানিবণ্টন সমস্যাঃ
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। বাংলাদেশ এই নদীর পানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রাজি না হওয়ায় চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে না। অথচ ভারতের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে বাংলাদেশকে বছরের পর বছর পানি সংকটে ভুগতে হচ্ছে।
২. সীমান্ত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনঃ
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনা প্রায়শই ঘটে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনায় ভারতের দুঃখপ্রকাশ ছাড়া কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। বাংলাদেশের তরফ থেকেও কোনো কঠোর বার্তা বা কূটনৈতিক চাপ দৃশ্যমান নয়।
৩. বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাঃ
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ভারতের অনুকূলে। বাংলাদেশ ভারত থেকে হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি করলেও, ভারত বাংলাদেশি পণ্যে নানা অজুহাতে শুল্ক আরোপ করে ও রপ্তানি সীমাবদ্ধ করে। এতে বাংলাদেশের উৎপাদক ও রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪. ট্রানজিট ও অবকাঠামো ব্যবহারঃ
বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে আসছে। ভারত সড়ক, নদীপথ, বন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ ডলার সাশ্রয় করছে, অথচ বাংলাদেশ তেমন কোনো অর্থনৈতিক বা কৌশলগত লাভ পাচ্ছে না।
৫. রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপঃ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। বিভিন্ন সময়ে ভারতের সমর্থিত বা পছন্দনীয় দল বা নেতৃত্বকে সুবিধা দিতে বাংলাদেশ সরকার এমন কিছু নীতি গ্রহণ করেছে যা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী।
জনগণের প্রতিক্রিয়া: চেতনার জাগরণঃ
বাংলাদেশের জনগণ এখন আর আগের মতো নির্বিকার নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টকশো, রাজনৈতিক আলোচনা এবং জনমত জরিপে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—দেশের মানুষ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক চায়, তবে তা সমান মর্যাদার ভিত্তিতে। চোখে চোখ রেখে, আত্মমর্যাদা বজায় রেখে। জনগণ চায় না বাংলাদেশ এমন এক নীতিতে চলুক যেখানে ভারতের মনোভাবের ওপর নীতি নির্ভর করে।
বর্তমানে দেশের তরুণ সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা চাইছে একটি ন্যায্য, যুক্তিভিত্তিক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। তারা বলছে—যে দল বা সরকার ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দেবে, তাকে জনগণ ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
নতজানু নীতির রাজনৈতিক পরিণতিঃ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি ভারতের সন্তুষ্টিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখে, তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জাতীয় স্বাধীনতা এবং জনগণের মতামতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। দেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, যারা জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতের স্বার্থে কাজ করেছে, তাদের প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে পড়েছে। একুশ শতকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবলমাত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
কূটনৈতিক বিকল্প ও সুপারিশঃ
বাংলাদেশের উচিত এখন একটি বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা, যেখানে কেবল ভারতের ওপর নির্ভরতা থাকবে না। কিছু সুপারিশ নিচে দেওয়া হলো—
১. বহুপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারঃ
বাংলাদেশ চীন, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক গভীর করতে পারে। এতে ভারতের একাধিপত্য কমবে।
২. আঞ্চলিক জোটে সক্রিয় অংশগ্রহণঃ
বিমসটেক, সার্ক, ওআইসি-সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটে বাংলাদেশকে আরো সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা নিতে হবে। ভারতের বাইরে বাকি দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করা দরকার।
৩. পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি ও মিডিয়া ব্যবহারঃ
জনগণকে সচেতন করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী করতে হবে। গণমাধ্যমে ভারতীয় প্রভাব মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার।
৪. চুক্তি ও সুবিধায় স্বচ্ছতা ও পর্যালোচনাঃ
ভারতের সঙ্গে করা প্রতিটি চুক্তি, সুবিধা ও সহযোগিতা প্রকল্প পর্যালোচনা করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে যেটি ক্ষতিকর, সেটি বাতিল বা সংশোধন করতে হবে।
#বাংলাদেশ আর ভারতের অধীনে থাকা দেশ নয়, স্বাধীন এক রাষ্ট্র যার আছে নিজস্ব পরিচয়, শক্তি ও আত্মমর্যাদা। সম্পর্ক হতে হবে বন্ধুত্বপূর্ণ, কিন্তু আত্মসমর্পণমূলক নয়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জনগণ তাদের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট করেছে—”চোখে চোখ রেখে সম্পর্ক চাই”। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব অটুট থাকুক, কিন্তু তা যেন হয় সমান মর্যাদার ভিত্তিতে, জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে।
যদি কোনো সরকার বা নেতৃত্ব এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভারতের স্বার্থে কাজ করে, তবে জনগণ তা ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করবে—এটাই সময়ের দাবি।