বিধি ভঙ্গ করে বেরোবিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া

রংপুর ব্যুরো: শিক্ষক নিয়োগের শর্ত সংশোধন না করেই বিধি ভঙ্গ করে দিয়ে ৮ বিভাগে ১২টি পদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। অদ্ভুত সব শর্ত দিয়ে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহলে চলছে নানান সমালোচনা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতর থেকে শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। যার স্মারক নং- বেরোবি/রেজি/শিক্ষকনিয়োগ-বিজ্ঞপ্তি/২০২১/১৬২২। ওই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রার্থীদের আবেদন করার শেষ দিন ছিল গত ১৩ ডিসেম্বর ২০২১।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গণিত বিভাগে একজন অধ্যাপক (স্থায়ী) ও একজন সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) , ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে দুইজন সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী) এবং একজন সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) , ইলেকট্রিক্যাল এ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (ইইই) বিভাগে একজন সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগে একজন সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী), পরিসংখ্যান বিভাগে একজন সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) , লোক প্রশাসন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকের বিপরীতে একজন প্রভাষক ( অস্থায়ী) ও শিক্ষা ছুটির বিপরীতে একজন প্রভাষক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে একজন প্রভাষক (স্থায়ী) এবং ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগে শিক্ষা ছুটির বিপরীতে একজন প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হবে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গণিত বিভাগে একজন অধ্যাপক (স্থায়ী) ও একজন সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) পদে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। এখানে সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) পদের ঠিক নিচে (ব্র্যাকেট বন্দিতে) ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ এর মাধ্যমে শুন্য হওয়া পদ’ লেখা হয়েছে।
আবেদনের শর্তে প্রতিটি স্তরে বলা হয়েছে, ‘অভ্যন্তরীন প্রার্থীর ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা যেতে পারে’। তবে, একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে কয়টি বিষয় বা কী কী বিষয়ের উপর শর্ত শিথিল হবে তা উল্লেখ নেই। আর ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ এর মাধ্যমে শুন্য হওয়া পদ’ এই পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগের কোন বিধান রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই বলেও দাবী করছেন সংশ্লীষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানা গেছে, আটটি বিভাগের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে যে সব বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগ পদের বিপরীতে কেউ কেউ কর্মরত আছেন। এছাড়াও, অনেক শিক্ষকের অর্জিত ছুটি দিয়ে সেগুলো পদ শুন্য করার মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ একজন শিক্ষক অর্জিত ছুটি নিলেই ওই পদ শুন্য হয় এমন কোন বিধান বিশ^বিদ্যালয়ের বিধিতে উল্লেখ নেই।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপক পদে শিক্ষক না থাকায় ওই পদের বিপরীতে ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর মোছা. আইরিন আকতারকে প্রভাষক (অস্থায়ী ) পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি বর্তমানে কর্মরত আছেন। আইরিন আকতার চলতি বছরের ৫ অক্টোবর পরবর্তী তিন মাসের জন্য অর্জিত ছুটির আবেদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত ২২ নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত তাঁর ছুটির আবেদন মঞ্জুর করেন।
এদিকে, আইরিন আকতারের এই তিন মাসের ছুটির ফাঁকে অধ্যাপক পদে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। যেহেতু আইরিন আকতার অধ্যাপক পদের বিপরিতে প্রভাষক পদে নিয়োগ নিয়ে ছুটিতে আছেন, তাহলে ওই পদে কিভাবে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয় তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, ওই বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের স্থায়ী পদে কমলেশ চন্দ্র রায় কর্মরত থাকলেও (পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক) এই বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে । প্রশ্ন উঠেছে, গণিতবিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেয়া হলে কমলেশ চন্দ্র রায় কোন পদে চাকুরি করেন বা করবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা’ অনুযায়ী প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পদ পর্যন্ত নিয়োগের বিষয়ে কোথাও শর্ত শিথিল করার কোন বিষয় উল্লেখ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ এর মাধ্যমে শুন্য হওয়া পদ’ এমন পদ্ধতি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধির কোথাও উল্লেখ নেই।
তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে শর্ত শিথিল করে কাউকে নিয়োগ দিলে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত হতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করতে হলে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হয়। ২৩ নভেম্বরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ক্ষেত্রে কোনটিই করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরিন কোন প্রার্থীকে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে যে কোন একটি বিষয়ে শর্ত শিথিল হতে পারে। যেমন, কখনো কারো বয়স ৩৫ এর বেশী হলে, অথবা পরীক্ষার ফলাফল বা প্রকাশনা এসব বিষয়ে কোন ঘাটতি থাকলে সেটি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয়ে কিছুই স্পষ্ট করা নেই।
এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) ১টি পদে নিয়োগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ এর মাধ্যমে শুন্য হওয়া পদ’ এই পদ্ধতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এবং অদ্ভুত বলে মনে করেন শিক্ষক নেতারা।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চাকুরি প্রত্যাশি জানিয়েছেন, এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি লোক দেখানো। যেভাবে ছক কষে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে তাতে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে আগে থেকেই চুড়ান্ত করা হয়েছে। নিজস্ব প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে এই ছক কষেছেন। নামে মাত্র পরীক্ষা নেয়া হবে। আমরা মনে করি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের সব আইন মানা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা কর্মচারীদের একাংশের সংগঠন অধিকার সুরক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোঃ মতিউর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরিক প্রার্থীর বিষয়ে কিছু বিষয় শিথিল হয় সেটা সব ক্ষেত্রে। তবে কোন কোন বিষয় শিথিল করা হবে সেটা উল্লেখ থাকলে ভালো হতো। ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ এর বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ডিপার্টমেন্টের প্লানিং কমিটি সুপারিশ করতে পারে। তবে বিষয়টা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কীভাবে নিবেন সেটা তাদের বিষয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশিদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ এই আইন ব্যবহার করা হচ্ছে। আরেকটা বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে সময় এবং খরচের ক্ষতি কমানোর জন্য আসলে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটা আইনের কোথাও লেখা নাই। এটা শিক্ষকদের ভালোর জন্যই করা হয়েছে।
অর্জিত ছুটির বিপরীতে ফাঁকা পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা ছুটির ক্ষেত্রে যেভাবে ফাঁকা পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ঠিক সেভাবেই এই অর্জিত ছুটির ক্ষেত্রেও। যেহেতু এটাও পদ খালি করেই ছুটিতে চলে যায়। শর্ত শিথিলের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবলেম সলভ করার জন্যই এগুলো করা হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও নেই সিন্ডিকেটেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে, সিন্ডিকেটে যাবে। কবে বা কোন সিন্ডিকেটে বিষয়টা তোলা হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, এটা তো আর এমন কোন বিষয় নয় যা সিন্ডিকেটে তুলে আইন পাশ করতে হবে। তবে ইনফরমালি আমি তাদের সাথে আলোচনা করে নিয়েছি। ইন্টারনালদের ব্যাপারে অগ্রধিকার তো দেয়া যেতেই পারে। তিনি আরও বলেন, সমস্যা সামাধনের জন্যই তো আমি এখানে আছি। এতে তো কারও কোন সমস্যা হচ্ছে না। যারা সমস্যায় আছেন তাদের সুবিধার জন্যই এটা করা হয়েছে।




