Uncategorized

বিক্রি করা সন্তানকে ফিরে পেতে আদালতে মায়ের বিষপান

অর্থের অভাবে পড়ে মাসখানেক বয়সের সন্তান আব্দুল্লাহকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন পারভীন বেগম। কিন্তু মায়ের মন কাঁদে সারাক্ষণ। বর্তমানে ছেলের বয়স ৭ মাস। এখন নিজের দুধের শিশুকে ফিরে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন দরিদ্র পারভীন।
১৫ সেপ্টেম্বর, রবিবার দুপুরে মামলার শুনানিকালে আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে একপর্যায়ে সেখানেই বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি।
তখন সন্তানকে ফিরে পেতে বিচারকের কাছে আকুতি-মিনতি করেন পারভীন বেগম। সন্তানের প্রতি মায়ের মায়া ও কষ্টমাখা আবেদন দেখে এজলাশে উপস্থিত সবার চোখে পানি চলে আসে। এক পর্যায়ে কোমড়ে শাড়ির মধ্যে রাখা কীটনাশকের বোতল বের করে তা পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। অতর্কিত তার এমন কাণ্ডে বিচারকসহ আদালতে উপস্থিত সকলে বিস্মিত হয়ে যান। এর পরপরই বিচারক সেই দিনের মতো ওই মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন।
রবিবার বরিশালের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রূম্পা ঘোষের আদালতে ঘটনাটি ঘটে। বিচারক রূম্পা ঘোষ আগামী ৯ অক্টোবর মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য্য করেন। পারভীন বেগমের বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খাদেমের সমিল সংলগ্ন এলাকায়।
এদিকে সন্তান বিক্রির কথা অস্বীকার করে পারভীন বেগম দাবি করছেন, যাদের কাছে বর্তমানে সন্তান আছে তাদের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন তিনি। এনজিও থেকে টাকা তোলার কথা বলে তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে সন্তান বিক্রির ভুয়া চুক্তি তৈরি করে তার ছেলেকে কেড়ে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খাদেমের সমিল সংলগ্ন এলাকার পারভীন বেগমের সঙ্গে কয়েক বছর আগে একই এলাকার দিনমজুর মো. নুরুজ্জামানের বিয়ে হয়। পারভীন বেগম অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে নুরুজ্জামান তাকে ফেলে চলে যান। দরিদ্র পারভীন বেগম ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। গৃহকর্মীর কাজ নেন কয়েকটি বাসায়। ৭ মাস আগে পারভীন বেগম একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের নাম রাখেন আব্দুল্লাহ। সন্তান জন্মের পর অভাব-অনটন আরো বেড়ে যায় তার।
সন্তানের ভরণ-পোষণে কষ্ট হওয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে সাহায্যের হাত পেতে নিরাশ হন। দারিদ্র্য আর অসহায়ত্বের কাছে হার মেনে নিজের দুধের সন্তান বিক্রির চেষ্টা করেন পারভীন। সন্তান বিক্রির খবর পেয়ে একই এলাকার বাসিন্দা কাছেম মোল্লার ছেলে আনোয়ার মোল্লা পারভীনের কাছে যান। সেই সঙ্গে আনোয়ার মোল্লার সহযোগী বানারীপাড়া উপজেলার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের আহমদাবাদ বেতাল গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে মো. সালেক পারভীন বেগমকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রলোভন দেখান। অর্থের প্রলোভনে পড়ে গত জুলাই মাসে পারভীন তার দুধের সন্তানটিকে আহমাদাবাদ বেতাল ক্লাব সংলগ্ন ফরাজি বাড়ির প্রবাসী গাফ্ফার ফরাজীর নিঃসন্তান স্ত্রী নাছরিন আক্তারের কাছে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
সন্তান ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও পারভীন বেগমের হাতে ৪০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন আনোয়ার মোল্লা ও তার সহযোগী সালেক। বাকি ৩০ হাজার টাকা তারা আত্মসাত করেন। এছাড়া সন্তান বিক্রির বিষয়টি পাকাপোক্ত করতে নাছরিন আক্তারের পক্ষে পারভীন বেগমকে আদালতে নিয়ে একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেন তারা।
এদিকে পারভীন বেগম সন্তান বিক্রির পর ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। দুধের সন্তানকে ফিরে পেতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ধর্ণা দিতে থাকেন তিনি।
পারভীন বেগম বানারীপাড়া থানা পুলিশের কাছে গেলে পুলিশ উভয়পক্ষের কথা শুনে পারভীনকে সন্তান বিক্রির টাকা ফেরত দিতে বলেন। পুলিশ পারভীনকে টাকা ফেরত দিয়ে সন্তান নেয়ার পরামর্শ দিলে তিনি থানা থেকে চলে যান। সন্তানকে ফিরে পেতে গত ২৪ জুলাই বরিশাল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন।
বাদীর আইনজীবী তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘পারভীন বেগম তার ৭ মাসের ছেলে সন্তান আব্দুল্লাহকে বিক্রি করেননি। সন্তান জন্ম নেওয়ার পর প্রবাসী গাফ্ফার ফরাজীর নিঃসন্তান স্ত্রী নাছরিন আক্তারের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন তিনি। পারভীন বেগমকে ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে দেয়ার কথা বলে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন নাছরিন আক্তার। এরপর ৭ মাসের ছেলে সন্তান আব্দুল্লাহকে রেখে পারভীনকে তাড়িয়ে দেয় নাছরিন আক্তার।’
তবে মামলার বিবাদী নাছরিন আক্তারের আইনজীবী হুমায়ূন কবির বলেন, ‘এজলাসে বিষপান করার চেষ্টার ঘটনা এটাই প্রথম। এটা নিঃসন্দেহে আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা। এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য পারভীনের কঠিন বিচার হওয়া উচিত।’
সুত্র : বাংলা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button