বিবিধ

বাড়ি যাচ্ছে মুক্তমনি

বাড়ি যাচ্ছে মুক্তমনি। মা, বাবা ও ছোট ভাইয়ের সাথে ভোরে হাসপাতাল ছাড়বে বিরল রোগে আক্রান্ত মুক্তামনি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে প্রথম দফা চিকিৎসা গ্রহণ শেষে আগামীকাল শুক্রবার সাতক্ষীরা গ্রামের বাড়ি উদ্দেশে রওনা হবে সে।
চিকিৎসকরা জনিয়েছেন, মাস খানেক ছুটি কাটিয়ে আবার হাসপাতালে ফিরে আসবে মুক্তামনি। শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন থাকায় ও ভোরে গাড়ি ঠিক করায় মুক্তার হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেয়ার যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা আজ বৃহস্পতিবারই সম্পন্ন হয়েছে।
মুক্তামনির বাবা ইবরাহীম হোসেন নয়াদিগন্তকে বলেন, ডাক্তাররা ওকে ছাড়পত্র দিয়েছেন। তিনটা ওষুধ আর অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। আল্লাহ’র ইচ্ছায় শুক্রবার সকাল ৫-৬টার দিকে সাতক্ষীরার উদ্দেশে রওনা দিতে চাই। সেন স্যার আমাকে ফোনে যোগাযোগ করতে বলেছেন। একমাস পর আবারও চেকআপের জন্য আসতে বলেছেন।
মুক্তামনি বলে, আমি চলে যাচ্ছি। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।
আজ বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, মুক্তামণির চিকিৎসা শেষ হয়নি। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস ধরে হাসপাতালে থেকে থেকে সে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। তাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে মাস খানেকের ছুটিতে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে।
তিনি জানান, মা, বাবা ও ছোট ভাইয়ের সাথে মুক্তামণিকে গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব খরচে গাড়ি ভাড়া করে দিয়েছে। বাড়িতে অবস্থানকালে হাতের যত্নে কী করতে হবে, কোন ওষুধ কয় বেলা কিভাবে সেবন করতে হবে সে ব্যাপারে তার বাবা মাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। বাড়ি ফেরার অনুমতি পাওয়ায় মুক্তামণি খুব খুশি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে গত সোমবার মেডিক্যাল বোর্ড বসে মুক্তামনিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। এ প্রসঙ্গে ওই দিন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, মিটিংয়ে আমরা মোটামুটি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওকে ছেড়ে দেয়ার। মুক্তামনির বাবাকে ডেকে বোর্ডের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। মুক্তামনির বাবা-মা নিজেদের সুবিধামত হাসপাতাল ছেড়ে যাবেন।
কবে নাগাত যেতে পারে এমন প্রশ্নে জাবাবে ওই দিন ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছিলেন, আমরা সিদ্ধান্ত বলে দিয়েছি। হয়তো ওর বাবার একটু ঘুচগাছের সময় লাগতে পারে। তবে এ সপ্তাহের শেষে না হয় আগামী সপ্তাহের প্রথম দিকে তারা চলে যাবেন।
তিনি আরো বলেন, মেয়েটিও বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেছে। তাই আমরাও চাই কিছু দিনের জন্য ঘুরে আসুক। মুক্তামনির চেকআপের ব্যাপার আছে, ওষুধপত্র বুঝে নেয়ার ব্যাপার আছে। এখন ছেড়ে দিলেও আমরা পরে তাকে আবার দেখবো। সে আমাদের নিয়মিত চেকআপে থাকবে। এবার ছেড়ে দেয়ার পর আবার কবে আসতে হবে এটা মুক্তামনির বাবা-মাকে বলে দেয়া হবে।
ডা. সামন্ত লাল বলেন, মুক্তামনি ভালো আছে। তবে মুক্তামনির যে সমস্যা, সেটা কখনই শতভাগ সুস্থ হবে না। তবে যাতে ভালো থাকতে পারে আমরা সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
সাতক্ষীরার কামারবাইশালের মুদির দোকানদার ইব্রাহিম হোসেনের দুই যমজ মেয়ে হীরামনি ও মুক্তামনি। জন্মের দেড় বছর পর থেকে মুক্তামনির সমস্যা শুরু। প্রথমে হাতে টিউমারের মতো হয়। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত টিউমারটি তেমন বড় হয়নি। কিন্তু পরে তা ফুলে কোলবালিশের মতো হয়ে যায়। মুক্তামনি বিছানায় বন্দী হয়ে পড়ে।
হাতে পুঁজ জমে থাকায় তা থেকে সব সময় দুর্গন্ধ বের হতো।
হীরামনি ছাড়া অন্য কোনো শিশু এমনকি বড়রাও কাছে ঘেষতেন না।
মুক্তামনি এখন পর্যন্ত এক বছর তিন মাস বয়সী ছোট ভাইকে কোলে পর্যন্ত নিতে পারেনি।
সাতক্ষীরা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় নানা চিকিৎসা চলে। তবে ভালো হয়নি বা ভালো হবে সে কথা কেউ কখনো বলেননি।
গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে খবর প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনায় আসে মুক্তামনির খবর। ১১ জুলাই মুক্তাকে ভর্তি করানো হয় বার্ন ইউনিটে। তারপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তামনির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।
মুক্তামনির জন্য গঠিত আট সদস্যের মেডিকেল বোর্ড জানায়, মুক্তামনি বিরল রোগে আক্রান্ত। রোগটির নাম ‘হাইপারকেরাটোসিস’।
পরবর্তীতে মুক্তামনির কাগজপত্র সিঙ্গাপুরে পাঠান বার্ন ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন।
ওই দেশের একটি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে কথাও হয়। তবে সিঙ্গাপুরের ওই হাসপাতাল মুক্তামনির অস্ত্রোপচার করায়নি, ওদের ভাষায়, তা সম্ভব না।
ওই চ্যালেঞ্জই নেয় বার্ন ইউনিট।
মুক্তামনির হাতে ১০ অক্টোবর প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। তার হাতের ফোলা অংশ অস্ত্রোপচার করে ফেলে দেন চিকিৎসকরা। পরে দুই পায়ের চামড়া নিয়ে দু’দফায় তার হাতে লাগানো হয়।
বার্ন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালামের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ একদল চিকিৎসক মুক্তামনির স্কিন গ্রাফটিং (চামড়া লাগানো) অপারেশনে অংশ নেন। পরে হাত আবার ফুলে যাওয়ায় তা কমাতে হাতে প্রেসার ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের দাবি, এখন অনেকটাই সুস্থ মুক্তামনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button