
কালবেলা ডেস্ক: একটি গানই বদলে দিয়েছে পরিচয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরুলসংগীত গেয়ে ভাইরাল হওয়া লাইলী বেগম এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে ফরিদপুর শহরের মানুষের কাছে তিনি বহুদিন ধরেই পরিচিত ‘লাইলী খালা’, ‘লাইলী পাগলি’ কিংবা ‘মাটির শিল্পী’ নামে।
৬৫ বছর বয়সী এই ভবঘুরে শিল্পীর জীবন কেটেছে পথেই। শহরের অলিগলি, মেলা, মাজার কিংবা গানের আসর— যেখানেই গান, সেখানেই উপস্থিত হন তিনি। দাওয়াত থাকুক বা না থাকুক, সুযোগ পেলেই গান ধরেন। কারণ গানই তার জীবন, গানই তার আশ্রয়।
সম্প্রতি ফরিদপুরে নজরুল জয়ন্তীর এক অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল’ পরিবেশন করেন লাইলী বেগম। তার কণ্ঠে গানটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যান তিনি।
শহরতলির হারুকান্দি এলাকায় ছোট্ট একটি ঘর থাকলেও সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন না লাইলী বেগম। কখনো মাজারে, কখনো পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতে, আবার কখনো কোনো গানের আসরে রাত কাটান তিনি। কাঁধে একটি থলে আর গায়ে জীর্ণ পোশাক— এভাবেই তার দিনযাপন।
স্থানীয়রা জানান, শৈশবেই মা-বাবাকে হারান লাইলী বেগম। এমনকি তাদের পরিচয়ও জানেন না তিনি। পরে ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার এক নারী তাকে লালন-পালন করেন। পালিত মায়ের কাছ থেকেই গান শেখা শুরু। তিনিই হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন গানের আসরে নিয়ে যেতেন।
লাইলী বেগম ছিলেন হারুকান্দি এলাকার মৃত শেখ ইসলামের প্রথম স্ত্রী। তাদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তবে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ বছর আগে স্বামীর সংসার ছেড়ে বেরিয়ে যান তিনি। পরে আর স্থায়ীভাবে বাড়ি ফেরেননি।
নিজের জীবন নিয়ে লাইলী বেগম বলেন, ‘গানই আমার জীবন। গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। গান মানুষের আত্মার খোরাক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কেউ মূল্যায়ন করে না। তবে আমি মানুষের ভালোবাসা পাই, এটাই বড় কথা।’
ফরিদপুরের প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে তাকে দেখছি। তিনি খুব ভালো মনের মানুষ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান, গান করেন, কিন্তু কারও কোনো ক্ষতি করেন না।’
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম বলেন, ‘লাইলী বেগম শিল্প-সংস্কৃতির মানুষের কাছে পরিচিত মুখ। তিনি খুব মানবিক একজন মানুষ। একবার একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর তাকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি ১০০ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন—‘অত লাগবে না, যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।’
পথে পথে ঘুরে বেড়ানো সেই শিল্পী আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। তবে তার কাছে এখনো সবচেয়ে বড় পরিচয়— তিনি একজন গানের মানুষ।


